পুলিশের বন্দুকের সামনে এই দিনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন আবু সাঈদ
- Update Time : 04:49:51 am, Thursday, 16 July 2026
- / 24 Time View

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এরপর পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষার্থী। তার মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনও নতুন মোড় নেয়।
সেদিন চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুরে মোট ছয়জন শহীদ হন। আবু সাঈদের পাশাপাশি চট্টগ্রামে ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম, আসবাবশ্রমিক মো. ফারুক ও শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ এবং ঢাকায় নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান ও শিক্ষার্থী মো. সবুজ আলী নিহত হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। পরদিন রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন তারা।
মিছিল, সমাবেশ ও অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ১৫ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর বড় ধরনের হামলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হকিস্টিক, রড, জিআই পাইপসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন।
এই হামলার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী ও তৎকালীন সরকারদলীয় বিভিন্ন সংগঠনের হামলার ঘটনাও বাড়তে থাকে।
এর পরদিন, ১৬ জুলাই, ঘটে আন্দোলনের প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
সেদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে একাই দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের গুলির সামনে তিনি বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর একের পর এক গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। তার মৃত্যু আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে রূপ নেয় বৃহত্তর গণআন্দোলনে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকে মনে করেন, পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ যে সাহসের ইতিহাস তৈরি করেছেন, তা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার আত্মত্যাগের পর সারা দেশে শহীদের মিছিল দীর্ঘ হতে থাকে।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ওই দিন সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। ক্যাম্পাসে ছয়টি প্রাইভেট কার ও ১৩টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর সেদিন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সারা দেশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।
ঢাকায় সেদিন শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কার্জন হল ও চানখাঁরপুল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন। ঢাকার বাইরে অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এসব কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলা করে।
এসব হত্যাকাণ্ডের ছবি, ভিডিও ও সংবাদ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ১৬ জুলাই দুপুরের দিকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ধীরগতি দেখা দেয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার সাহস প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো এই তরুণের মৃত্যু আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।
ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা কম নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ক্ষুদিরাম বসু কিংবা বাংলার প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতার মতো আবু সাঈদও হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক। তার দেখানো পথে ২০২৪ সালের আন্দোলনে একে একে যুক্ত হন আরও অসংখ্য মানুষ।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে ৮৪৩ জন শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, তা পরে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শহীদের মিছিলই শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।

























