Dhaka 3:20 am, Friday, 7 August 2026

সিনেমার দিনবদল ও মানানসই সিনেমার দিকে জনগণের ঝোক

Ctg correspondent AL. TamiM
  • Update Time : 05:23:49 pm, Thursday, 6 August 2026
  • / 30 Time View

​বাংলা চলচ্চিত্র এক দারুণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গতানুগতিক ফর্মুলা, মারপিট আর অবাস্তব মেলোড্রামার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সমসাময়িক সিনেমাগুলো এখন অনেক বেশি গল্পনির্ভর, বাস্তবসম্মত এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। দর্শকও এখন শুধু বিনোদন নয়, পর্দায় নিজেদের জীবনের প্রতিফলন কিংবা গভীর কোনো বার্তা দেখতে কাটছেন টিকেট।
​গল্পের জয়জয়কার ও নতুন ধারার নির্মাতা
সমসাময়িক সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গল্প। প্রেম-ভালোবাসার চেনা ছকের বাইরে গিয়ে নির্মাতারা এখন মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, সামাজিক ব্যঙ্গবিদ্রূপ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন পর্দায় তুলে আনছেন। যেমন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সিনেমাটির কথাই ধরা যাক। গ্রামীণ পটভূমি ও মনস্তাত্ত্বিক রহস্যঘেরা এক ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং নির্মাতাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
​অভিনয়েও ভাঙছে চেনা ছক
শুধু পরিচালনায় নয়, অভিনয়ের ক্ষেত্রেও এক বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তারকাখ্যাতির চেয়ে চরিত্রের গভীরতা ও অভিনয়ের নিখুঁত প্রকাশ এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এমনকি দেশের শীর্ষ তারকারাও নিজেদের চেনা ইমেজ ভেঙে ভিন্নধর্মী ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করছেন। এর বড় উদাহরণ আজমান রুশোর মিউজিক্যাল ড্রামা ‘রকস্টার’। যেখানে শীর্ষ তারকা শাকিব খানকে এক সম্পূর্ণ নতুন লুকে ও মিউজিশিয়ানের চরিত্রে দেখা গেছে, যা তাঁর চেনা বাণিজ্যিক ঘরানার বাইরে গিয়ে এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
​হলবিমুখ দর্শক যখন হলমুখী
একটা সময় ছিল যখন দর্শক সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। নোংরা পরিবেশ আর মানহীন কনটেন্টের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হলবিমুখ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রুচিশীল সিনেমার জোয়ারে সেই খরা কেটেছে। তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে সব বয়সী দর্শক এখন অগ্রিম টিকিট কেটে, সপরিবারে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে কিংবা ‘রইদ’ ও ‘রকস্টার’-এর মতো বড় সিনেমাগুলোর মুক্তির পর সিনেমা হলগুলোতে যে উন্মাদনা দেখা গেছে, তা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক বিশাল আশার আলো।
​আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমা
সমসাময়িক বাংলা সিনেমা শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের নামকরা সব চলচ্চিত্র উৎসবে নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমা, কুড়াচ্ছে প্রশংসা ও পুরস্কার। বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে বাংলাদেশের নাম এখন বেশ সম্মানের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে, যা আমাদের আন্তর্জাতিক বাজার ধরার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
​চাঁলেঞ্জ ও আগামীর পথ
এতসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেও কিছু সংকট এখনো রয়ে গেছে। ঢাকার বাইরে মানসম্মত সিনেমা হলের অভাব, সেন্সর বোর্ডের পুরোনো কিছু নিয়ম এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের বাজেটের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব বাধা পেরিয়ে তরুণ ও অভিজ্ঞ নির্মাতাদের হাত ধরে সমসাময়িক সিনেমা যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
​সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, সুষ্ঠু পরিবেশন নীতি এবং দর্শকদের এই ধারাবাহিক ভালোবাসা বজায় থাকলে সমসাময়িক বাংলা সিনেমা খুব শীঘ্রই বিশ্ব দরবারে নিজস্ব এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সিনেমার দিনবদল ও মানানসই সিনেমার দিকে জনগণের ঝোক

Update Time : 05:23:49 pm, Thursday, 6 August 2026

​বাংলা চলচ্চিত্র এক দারুণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গতানুগতিক ফর্মুলা, মারপিট আর অবাস্তব মেলোড্রামার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সমসাময়িক সিনেমাগুলো এখন অনেক বেশি গল্পনির্ভর, বাস্তবসম্মত এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। দর্শকও এখন শুধু বিনোদন নয়, পর্দায় নিজেদের জীবনের প্রতিফলন কিংবা গভীর কোনো বার্তা দেখতে কাটছেন টিকেট।
​গল্পের জয়জয়কার ও নতুন ধারার নির্মাতা
সমসাময়িক সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গল্প। প্রেম-ভালোবাসার চেনা ছকের বাইরে গিয়ে নির্মাতারা এখন মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, সামাজিক ব্যঙ্গবিদ্রূপ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন পর্দায় তুলে আনছেন। যেমন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সিনেমাটির কথাই ধরা যাক। গ্রামীণ পটভূমি ও মনস্তাত্ত্বিক রহস্যঘেরা এক ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং নির্মাতাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
​অভিনয়েও ভাঙছে চেনা ছক
শুধু পরিচালনায় নয়, অভিনয়ের ক্ষেত্রেও এক বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তারকাখ্যাতির চেয়ে চরিত্রের গভীরতা ও অভিনয়ের নিখুঁত প্রকাশ এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এমনকি দেশের শীর্ষ তারকারাও নিজেদের চেনা ইমেজ ভেঙে ভিন্নধর্মী ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করছেন। এর বড় উদাহরণ আজমান রুশোর মিউজিক্যাল ড্রামা ‘রকস্টার’। যেখানে শীর্ষ তারকা শাকিব খানকে এক সম্পূর্ণ নতুন লুকে ও মিউজিশিয়ানের চরিত্রে দেখা গেছে, যা তাঁর চেনা বাণিজ্যিক ঘরানার বাইরে গিয়ে এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
​হলবিমুখ দর্শক যখন হলমুখী
একটা সময় ছিল যখন দর্শক সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। নোংরা পরিবেশ আর মানহীন কনটেন্টের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হলবিমুখ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রুচিশীল সিনেমার জোয়ারে সেই খরা কেটেছে। তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে সব বয়সী দর্শক এখন অগ্রিম টিকিট কেটে, সপরিবারে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে কিংবা ‘রইদ’ ও ‘রকস্টার’-এর মতো বড় সিনেমাগুলোর মুক্তির পর সিনেমা হলগুলোতে যে উন্মাদনা দেখা গেছে, তা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক বিশাল আশার আলো।
​আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমা
সমসাময়িক বাংলা সিনেমা শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের নামকরা সব চলচ্চিত্র উৎসবে নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমা, কুড়াচ্ছে প্রশংসা ও পুরস্কার। বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে বাংলাদেশের নাম এখন বেশ সম্মানের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে, যা আমাদের আন্তর্জাতিক বাজার ধরার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
​চাঁলেঞ্জ ও আগামীর পথ
এতসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেও কিছু সংকট এখনো রয়ে গেছে। ঢাকার বাইরে মানসম্মত সিনেমা হলের অভাব, সেন্সর বোর্ডের পুরোনো কিছু নিয়ম এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের বাজেটের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব বাধা পেরিয়ে তরুণ ও অভিজ্ঞ নির্মাতাদের হাত ধরে সমসাময়িক সিনেমা যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
​সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, সুষ্ঠু পরিবেশন নীতি এবং দর্শকদের এই ধারাবাহিক ভালোবাসা বজায় থাকলে সমসাময়িক বাংলা সিনেমা খুব শীঘ্রই বিশ্ব দরবারে নিজস্ব এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের।