চীনের সশস্ত্র বাহিনী গত বছরের শেষ দিকে প্রায় ২০০ রুশ সামরিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ পরে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা নথিতেও এ তথ্য উঠে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে রুশ ও চীনা সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তিতে এ প্রশিক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বেইজিং ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সেনারা পরে চীনে প্রশিক্ষণ নেন।
চুক্তিতে আরও বলা হয়, শত শত চীনা সেনাকেও রাশিয়ার সামরিক স্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণে মূলত ড্রোন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, আর্মি অ্যাভিয়েশন ও সাঁজোয়া পদাতিক কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। চুক্তিতে এসব সফর নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, কোনো তৃতীয় পক্ষকে এ বিষয়ে জানানো যাবে না।
এক ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, রুশ সামরিক সদস্যদের কৌশলগত ও কার্যকর পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর মাধ্যমে ইউরোপীয় ভূখণ্ডের এ যুদ্ধে চীনের সম্পৃক্ততা আগের ধারণার তুলনায় আরও প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। তবে চীন আবারও দাবি করেছে, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, 'ইউক্রেন সংকটের বিষয়ে চীন সব সময় নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে কাজ করেছে। এই অবস্থান ধারাবাহিক, স্পষ্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা প্রত্যক্ষ করেছে।' তারা আরও বলেছে, 'সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত নয় ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়ানো বা দোষ চাপিয়ে দেওয়া।'
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ওই বছরের আগ্রাসনের কয়েক দিন আগে দুই দেশ 'সীমাহীন' কৌশলগত অংশীদারত্ব ঘোষণা করে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছিল, তখন চীন রাশিয়ার তেল, গ্যাস ও কয়লা কিনে দেশটিকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়। একই সময়ে দুই দেশ যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়ে আসছে।
এদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আজ বুধবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এটি চীনে পুতিনের ২৫তম সফর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচিত সফরের এক সপ্তাহেরও কম সময় পর এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীন ও রাশিয়া এ সফরকে তাদের 'সব সময়ের অংশীদারত্বের' আরও একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো বেইজিংকে চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর প্রভাব খাটায়।
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন এখন অন্যতম প্রধান অস্ত্র। দুই পক্ষই শত শত মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরক বহনকারী ফার্স্ট পারসন ভিউ (এফপিভি) প্রযুক্তিনির্ভর ছোট ড্রোনও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বরাতে গত সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা রুশ আক্রমণাত্মক ড্রোন প্রস্তুতকারকের জন্য সামরিক ড্রোনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কাজ করেছেন। তখন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা এ সহযোগিতার বিষয়ে অবগত নয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
দুই ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২০২৪ সাল থেকে চীনা সেনাদের রাশিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হলেও চীনে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা নতুন। তাদের ভাষ্য, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা থাকলেও চীনের বড় ড্রোন শিল্প খাত উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দিতে সক্ষম। বিশেষ করে ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কয়েক দশক ধরে বড় কোনো যুদ্ধে অংশ না নিলেও গত ২০ বছরে তাদের সামরিক শক্তি দ্রুত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সমকক্ষ বলে মনে করা হয়। দুই গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া রুশ সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষক পর্যায়ের কর্মকর্তা। ফলে তাঁরা পরে এ অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, তারা এমন কয়েকজন রুশ সামরিক সদস্যের পরিচয় নিশ্চিত করেছে, যারা চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ইউক্রেনের অধিকৃত ক্রিমিয়া ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে ড্রোন-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধে অংশ নেন।
রয়টার্সের দেখা এক রুশ সামরিক নথিতে চীনে যাওয়া সেনাদের নাম ছিল। তবে পরে তাঁরা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি সংবাদ সংস্থাটি। একই গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া বহু সেনাই ইউক্রেনে গিয়েছেন বলে অত্যন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা রুশ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে চীনে রুশ সেনাদের জন্য অনুষ্ঠিত চারটি প্রশিক্ষণ সেশনের বিবরণ পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিজিয়াঝুয়াংয়ে পিএলএর গ্রাউন্ড ফোর্সেস আর্মি ইনফ্যান্ট্রি একাডেমির শাখায় প্রায় ৫০ জন রুশ সেনাকে যৌথ অস্ত্র যুদ্ধ কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে ৮২ মিলিমিটার মর্টার ব্যবহার শেখানো হয় এবং লক্ষ্য শনাক্তে ব্যবহার করা হয় মানববিহীন আকাশযান।
আরেকটি প্রতিবেদনে ঝেংঝৌর একটি সামরিক স্থাপনায় বিমান প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়। সেখানে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল, জাল নিক্ষেপকারী যন্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ড্রোন প্রতিহত করার অনুশীলন হয়। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল দিয়ে ড্রোনের সংকেত ব্যাহত করা হয়। আর জাল নিক্ষেপ করে কাছে আসা ড্রোন আটকে ফেলা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই পক্ষই এখন ফাইবার অপটিক ড্রোন ব্যবহার করছে, যেগুলো সূক্ষ্ম তারের মাধ্যমে পাইলটের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং ইলেকট্রনিকভাবে জ্যাম করা যায় না। সাধারণত এসব ড্রোনের পাল্লা ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার হলেও কিছু ড্রোন ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের ইয়িবিনের পিএলএ ট্রেনিং সেন্টার ফর মিলিটারি অ্যাভিয়েশনের ফার্স্ট ব্রিগেডে রুশ সেনাদের ড্রোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা, ফ্লাইট সিমুলেটর এবং বিভিন্ন ধরনের এফপিভি ড্রোন ব্যবহারের অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আরেক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পিএলএর নানজিং ইউনিভার্সিটি অব মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পরিচালিত একটি কোর্সের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বিস্ফোরক প্রযুক্তি, মাইন স্থাপন, মাইন নিষ্ক্রিয়করণ, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ এবং ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) অপসারণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনের সঙ্গে থাকা ছবিতে দেখা যায়, ইউনিফর্ম পরা রুশ সেনাদের চীনা সামরিক প্রশিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সেখানে প্রকৌশল সরঞ্জাম ব্যবহার এবং মাইন শনাক্তের পদ্ধতিও শেখানো হয়।
Publisher: Mustakim Nibir
Copyright © 2026 The Times OF Dhaka. All rights reserved.