সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের জন্য কয়েক শ কোটি ডলারের তহবিল ছাড়তে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের সময় তেহরান একাধিকবার আমিরাতে হামলা চালিয়েছিল। এর পর নিজেদের কৌশলে পরিবর্তন আনল ধনী উপসাগরীয় দেশটি।ু
আমিরাতের এই পদক্ষেপের তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা আলোচনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন বিষয়টি সামনে আসে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ইরানের তেল বিক্রির হাজার হাজার কোটি ডলার আটকে রয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, চলমান আলোচনার মাধ্যমে ওই অর্থও ছাড় করা হতে পারে।
দুটি আঞ্চলিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত মোট ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার ইরানকে ছাড়তে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলারের বেশি ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
সমঝোতা সম্পর্কে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, আমিরাত যে অর্থ ছাড়বে তার পরিমাণ মোট দুই হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তাদের মতে, ইরান আর হামলা করবে না—এই শর্তে অর্থ ছাড়তে রাজি হয়েছে আমিরাত। সমঝোতা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, প্রথম কিস্তির ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে এই অর্থ আমিরাতের নিজস্ব নাকি আমিরাতের ব্যাংক বা অন্য কোথাও আটকে থাকা ইরানের অর্থ, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। অর্থ ছাড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের দেশ উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, 'পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।' তিনি আরও বলেন, 'সংঘাতের প্রভাব থেকে এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগসহ সব ধরনের প্রচেষ্টাকে আমিরাত সমর্থন করে।'
ইরান সর্বশেষ আমিরাতে হামলা চালায় ৪ মে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুক্রবার বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা বৈঠকে অংশ নিলেই ইরানের অর্থ ছাড় করা হবে না। তাঁর ভাষ্য, সম্ভাব্য চুক্তি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে ইরান প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্য চাওয়া হলেও ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় প্রতিবেদনে উল্লেখিত কোনো সূত্রই পরিচয় প্রকাশে রাজি হয়নি।
এই সমঝোতা যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের প্রকাশ্য বৈরিতার অবস্থান থেকে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যুদ্ধের সময় ইরানের হামলায় দুবাইয়ের হোটেলগুলো খালি হয়ে যায়, বহু প্রবাসী আমিরাত ছাড়েন এবং নিরাপদ ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে দেশটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সমঝোতা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, এই উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই নিজেদের 'রেড লাইন' অতিক্রম না করে সংঘাত সমাধানের সুযোগ পেয়েছে। ইরান বলতে পারবে তারা যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, ওয়াশিংটন বলতে পারবে তারা কোনো অর্থ দেয়নি, আর আবুধাবি নিজেদের নিরাপত্তা ও দুবাইয়ের ব্যবসায়িক অবস্থান বজায় রাখতে পারবে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলে আস্থা পুনর্গঠনের একটি বিনিয়োগ হিসেবেও উপস্থাপন করা যাবে।
আরেকটি সূত্র জানায়, অর্থ ছাড়ের বিনিময়ে ইরান আমিরাতের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ করবে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সূত্রটি আরও জানায়, একই ধরনের সমঝোতার জন্য ইরান অন্তত আরও দুটি উপসাগরীয় আরব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
আমিরাতের ওপর ইরানের সর্বশেষ সরাসরি হামলার খবর পাওয়া যায় এক মাসের বেশি আগে। গত ৪ মে ওমান উপসাগরে অবস্থিত আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ওই হামলা হয়েছিল।
সমঝোতা সম্পর্কে অবগত প্রথম সূত্রটি জানায়, কয়েক সপ্তাহ আগে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে ইরানের ক্ষমতাধর বিপ্লবী গার্ড কোরের কর্মকর্তারা আবুধাবি সফর করলে বিষয়টি গতি পায়। সেখানে তারা আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও আবুধাবির ডেপুটি শাসনকর্তা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর অতিথি ভবনে অবস্থান করেন।
ওই সফরের পর অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে আমিরাতের কর্মকর্তারা তেহরান সফর করেন।
দুবাইয়ে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ
আরব আমিরাত ও ইরানের এই চুক্তি এমন এক জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে হচ্ছে, যার সঙ্গে দুবাই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দুবাই আমিরাতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক শহর এবং ইরানের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
দুবাইয়ের ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। এর বড় অংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে আছে। বৈশ্বিক ডলার লেনদেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি থাকায় কালোতালিকাভুক্ত কোনো ইরানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ব্যাংকও মার্কিন আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
গত ১১ এপ্রিল ইরানের একটি শীর্ষস্থানীয় সূত্র জানিয়েছিল, কাতার ও অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে সেই দাবি অস্বীকার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র রয়টার্সকে জানায়, সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি 'হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার' সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চলমান সংঘাত বন্ধের আলোচনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
Publisher: Mustakim Nibir
Copyright © 2026 The Times OF Dhaka. All rights reserved.