ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখে নেতানিয়াহু এমন অবস্থান নিতে পারেন।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অথচ লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত।
নেতানিয়াহু সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই এই গোয়েন্দা মূল্যায়ন সামনে এসেছে। মার্কিন প্রশাসন প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে, যাতে তারা লেবাননে এমন কোনো হামলা না চালায় যা ট্রাম্পের চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর শুক্রবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
নেতানিয়াহু যদি লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেন, তবে তা শুধু বুধবার স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলবে না, ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বুধবার ফ্রান্সে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান "সমঝোতা স্মারক" ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেন, "লেবানন নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আমার একটু মতবিরোধ রয়েছে।"
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এ বছর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু দেশের জনগণকে দেখাতে চান যে তিনি লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন না এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বাড়াবেন। তার মতে, রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতেই তিনি এমন করছেন।
আরেক কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ট্রাম্পের চুক্তির শর্ত নিয়ে ইসরায়েলের অসন্তোষের কথাও উল্লেখ রয়েছে। ইসরায়েলের ধারণা, এই চুক্তি তেহরানের ওপর "সর্বোচ্চ চাপ" বজায় রাখার তাদের লক্ষ্যকে দুর্বল করবে।
সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল মনে করে চুক্তিটি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা সীমিত করবে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্ত হলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে এই চুক্তি ইসরায়েলকে বাধা দেবে না। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা এবং একটি চুক্তি সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে যুদ্ধবিরতি বা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারকে ইসরায়েলের ভেতরে নেতানিয়াহুর পরাজয় হিসেবে দেখা হবে।
মন্তব্য জানতে চাইলে ইসরায়েল সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো হিজবুল্লাহর ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে ইসরায়েলি নাগরিকদের রক্ষা করা।"
ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীও ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছিল।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উত্তর ইসরায়েলের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর নেতানিয়াহুর কাছে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার দাবি ওঠে। এই হুমকি পুরোপুরি দূর করতে না পারায় তিনি রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ইসরায়েলের থিংকট্যাংক 'ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ'-এর মে মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৭০ শতাংশ ইহুদি নাগরিক হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের পক্ষে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে পিছু হটা ভোটারদের কাছে পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল যদি বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা না বাড়িয়েও শুধু দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ভঙ্গুর চুক্তি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, "লেবাননের একাংশ দখল করে রাখাটা একটি বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইসরায়েল যদি পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার না করে, তবে (ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী) এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত।"
তবে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। শুক্রবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "ইসরায়েলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর জন্য এক হাজার লেবানিজ মায়ের কাঁদা উচিত। পুরো লেবানন পুড়ে যাওয়া উচিত।"
সাবেক ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে "বড় ধরনের সংঘাতের" ঝুঁকি নিচ্ছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর উৎসাহেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে ট্রাম্প দেখেন, এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।
সিট্রিনোভিজ বলেন, "বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) এখন খুব কঠিন পরিস্থিতিতে আছেন। তিনি দেখছেন যে তার সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ, ইরানকে মার্কিন প্রশাসন শক্তিশালী করছে—আর তিনি কিছুই করতে পারছেন না।"
চলতি মাসে পরপর দুই সপ্তাহান্তে হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ডের জবাবে বৈরুতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ৭ জুনের হামলার পর ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। পরে হোয়াইট হাউসের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
তবে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টা আগে রোববার বৈরুতে আবারও হামলা চালায় ইসরায়েল।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরও নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা বলছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না এবং হামলা অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জেডি ভ্যান্স বলেন, "এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।"
তিনি আরও বলেন, "আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের ওপর আমি এভাবে আক্রমণাত্মক হতাম না।"
বর্তমানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের ২০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেখানে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এখন পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে জেরুজালেমে নেতানিয়াহু বলেন, "যত দিন প্রয়োজন, আমরা লেবাননের নিরাপত্তা বাফার জোনে থাকব।" ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, "কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের মতের অমিল রয়েছে।"
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সাবেক বিশ্লেষক ও মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হ্যারিসন মান বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, "স্থায়ী যুদ্ধ এবং ভূখণ্ড সম্প্রসারণ—এ দুটিই কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলি রাজনীতির চালিকা শক্তি। সামনে নির্বাচন, তাই নেতানিয়াহুকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি তার প্রতিপক্ষের চেয়ে এগুলো আরও ভালোভাবে করতে পারেন।"
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে অস্ত্র, যুদ্ধবিমানের জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা ও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ সীমিত করতে পারে। এমনকি ইসরায়েলি আকাশসীমা রক্ষায় নিয়োজিত মার্কিন বাহিনীও প্রত্যাহার করতে পারে।
মান বলেন, "এগুলো ইসরায়েলের যেকোনো যুদ্ধের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।"
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলেন, অতীতে ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। ১৯৫৬ সালে সিনাই উপদ্বীপ থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার। ১৯৮১ সালে ইরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে হামলার পর প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহ বিলম্বিত করেছিলেন। আর প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পশ্চিম তীর ও গাজায় নতুন বসতি নির্মাণ বন্ধে চাপ দিতে ইসরায়েলকে দেওয়া আবাসন ঋণের গ্যারান্টি স্থগিত করেছিলেন।
Publisher: Mustakim Nibir
Copyright © 2026 The Times OF Dhaka. All rights reserved.