দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে টোল আদায়ের নামে চলছে এক বিশাল ডিজিটাল জালিয়াতি। সম্প্রতি আমাদের হাতে আসা কিছু নথিপত্র এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মেঘনা-গোমতীসহ বিভিন্ন টোল প্লাজায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে চলে যাচ্ছে একটি বিশেষ মহলের পকেটে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতি ১০ মিনিটে গড়ে অন্তত ১০টি গাড়ির টোলের টাকা মূল সার্ভারে জমা না হয়ে অন্য একটি গোপন সার্ভারে চলে যাচ্ছে। এই হিসাবে প্রতি ১০ মিনিটে প্রায় ১০,০০০ টাকা সরকারের অজান্তেই চুরি হচ্ছে।
টোল প্লাজায় দায়িত্বরত কর্মীরা অনেক সাধারণ গাড়িকে সিস্টেমে 'প্রতিবন্ধী' বা 'বিশেষ সুবিধাভোগী' হিসেবে এন্ট্রি দিচ্ছে। ফলে গাড়ি থেকে পূর্ণ টাকা নেওয়া হলেও কাগজে-কলমে তা 'শুল্কমুক্ত' দেখিয়ে পুরো টাকাটা আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
বেসরকারি কোম্পানির কারসাজি: 'রেপনাম রিসোর্সেস লিমিটেড' নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তাদের নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাটা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা খোদ সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।
বছরে ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি: এই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
অনুসন্ধানের বিস্তারিত:
দ্য টাইমস অব ঢাকা-এর হাতে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনৈক সিনিয়র সাংবাদিক যখন সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সএন) এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য-প্রমাণ সহ জেরা করেন, তখন তারা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ডক্টর নাজমুল হক টাইম জব থাকাকে জানান "আমরা তো এ বিষয়ে কিছুই জানিনা - এই জালিয়াতি হেড অফিস থেকে হয়, যদিও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ডক্টর নাজমুল হক এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।
সফটওয়্যার জালিয়াতি:
ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, টোল প্লাজার মনিটরে গাড়ির সংখ্যা এবং সংগ্রহের টাকার অংকের সাথে মূল ডাটাবেজের তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে। মেঘনা-গোমতী ব্রিজে ১ ঘণ্টায় ১৪টি গাড়ি পার হলেও ডাটাবেজে দেখাচ্ছে মাত্র ৪টি। বাকি ১০টি গাড়ির তথ্য রহস্যজনকভাবে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য:
সড়ক ও জনপথ নারায়ণগঞ্জ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, "আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি, তবে সিস্টেমের ভেতরে যে এত বড় গলদ আছে তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।" অন্যদিকে, টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ডাটা মুছে ফেলার বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও সাংবাদিকের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের সামনে তারা নিশ্চুপ হয়ে যান।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও প্রশ্ন:
সাধারণ গাড়ি চালকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৮০০-৯০০ টাকা টোল আদায় করা হলেও সেই টাকা কেন সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে না? কেন ১০ টাকা মূল্যের ডিজিটাল টোকেন দিয়ে ৯০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে?
দ্য টাইমস অব ঢাকা-এর এই অনুসন্ধান চলবে। এই দুর্নীতির শেকড় কতদূর এবং এর পেছনে আর কোন রাঘববোয়ালরা জড়িত, তা উন্মোচন করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
Publisher: Mustakim Nibir
Copyright © 2026 The Times OF Dhaka. All rights reserved.