Dhaka 1:14 am, Friday, 12 June 2026

প্রথমবারের মতো জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, ৫ হাজার চিকিৎসক ও আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা

নিউজ ডেস্ক
  • Update Time : 10:21:38 am, Thursday, 11 June 2026
  • / 35 Time View

দেশের সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসার ব্যয়ভার কমানো এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বড় চমক থাকছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে। আসন্ন এই বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের জন্য মোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার, যা দেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিশাল বাজেট উত্থাপন করবেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ)। সেই তুলনায় এবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে।

বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশের চিকিৎসাসেবা ও জনবল সংকট কাটাতে এই বাজেটে বিশাল নিয়োগের ঘোষণা থাকছে। এর মধ্যে দেশের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ ও সেবার মান বাড়াতে অবিলম্বে ৫ হাজার নতুন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত ও জনমুখী চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে নতুন করে আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করার রূপরেখা থাকছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ পদই নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। চিকিৎসকদের আধুনিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে গড়ে তুলতে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক দক্ষতা-ভিত্তিক নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর ঘোষণাও থাকছে এতে।

এ ছাড়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতের পেশাগত উন্নয়নে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতিদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৪ মাস মেয়াদি বিশেষ ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হবে। সরকারের এই নতুন স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো— চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া।

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। এছাড়া জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা ও শিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা রাখা হবে। অন্যদিকে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে করোনারি কেয়ার ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রীভূত করা হবে। প্রান্তিক এলাকার রোগীদের দ্রুত পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে একটি ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রতিটি নাগরিককে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের ঘোষণাও থাকছে এবারের বাজেটে।

পুষ্টি ও দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশেও বাজেটে বিশেষ নীতিগত সহায়তা রাখা হচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতি দূর করতে একটি সমন্বিত জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় ওষুধের অবস্থান সুদৃঢ় করতে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্প পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও বিনিয়োগে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা বহাল রাখা হচ্ছে।

সরকার মূলত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস উৎপাদনকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনাই এই প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

প্রথমবারের মতো জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, ৫ হাজার চিকিৎসক ও আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা

Update Time : 10:21:38 am, Thursday, 11 June 2026

দেশের সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসার ব্যয়ভার কমানো এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বড় চমক থাকছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে। আসন্ন এই বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের জন্য মোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার, যা দেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিশাল বাজেট উত্থাপন করবেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ)। সেই তুলনায় এবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে।

বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশের চিকিৎসাসেবা ও জনবল সংকট কাটাতে এই বাজেটে বিশাল নিয়োগের ঘোষণা থাকছে। এর মধ্যে দেশের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ ও সেবার মান বাড়াতে অবিলম্বে ৫ হাজার নতুন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত ও জনমুখী চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে নতুন করে আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করার রূপরেখা থাকছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ পদই নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। চিকিৎসকদের আধুনিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে গড়ে তুলতে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক দক্ষতা-ভিত্তিক নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর ঘোষণাও থাকছে এতে।

এ ছাড়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতের পেশাগত উন্নয়নে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতিদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৪ মাস মেয়াদি বিশেষ ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হবে। সরকারের এই নতুন স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো— চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া।

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। এছাড়া জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা ও শিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা রাখা হবে। অন্যদিকে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে করোনারি কেয়ার ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রীভূত করা হবে। প্রান্তিক এলাকার রোগীদের দ্রুত পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে একটি ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রতিটি নাগরিককে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের ঘোষণাও থাকছে এবারের বাজেটে।

পুষ্টি ও দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশেও বাজেটে বিশেষ নীতিগত সহায়তা রাখা হচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতি দূর করতে একটি সমন্বিত জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় ওষুধের অবস্থান সুদৃঢ় করতে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্প পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও বিনিয়োগে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা বহাল রাখা হচ্ছে।

সরকার মূলত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস উৎপাদনকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনাই এই প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য।