তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং, ৭ জেলায় বিক্ষোভ-ভাংচুর, ঢাকাতেও লোডশেডিং দেয়া হবে, বললেন মন্ত্রী
- Update Time : 04:52:17 am, Monday, 29 June 2026
- / 53 Time View

তাপপ্রবাহের সঙ্গে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে অন্তত সাত জেলায় গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেছেন। কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে লোডশেডিং হওয়ায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া, রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং এবং ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে লোডশেডিং বেড়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে লোডশেডিং বাড়ছে। ছুটির দিনেও লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পিজিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেলেও এখন রাত ১০টার পর থেকে লোডশেডিং বাড়ছে এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। তবে এতদিন রাজধানীসহ বড় শহরগুলো তুলনামূলকভাবে লোডশেডিংমুক্ত রাখা গেলেও কয়েক দিন ধরে তা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে দুই থেকে তিনবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন এলাকায় অনেক স্থানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন গ্রাহকরা। গত দুই সপ্তাহের মধ্যে শনিবার রাত ২টায় সর্বোচ্চ তিন হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। তখন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল রোববার রাত ৮টায় ১৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এক হাজার ৯৮৩ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখিয়েছে পিজিসিবি।
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে গতকাল টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, রাজশাহী, শেরপুর, সিলেট ও ঢাকা জেলার দোহারে বিক্ষোভ হয়েছে।
আর্জেন্টিনা-জর্ডান ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। কেন্দুয়া জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলী ওমর ফারুক বলেন, তাদের চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ মেগাওয়াট। তিনি হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশনের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করেন দেলদুয়ার ও মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দারা। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এ সময় সাবস্টেশন ভাঙচুরেরও চেষ্টা করা হয়।
ঢাকার দোহারের নুরপুর এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও এবং ঢাকা-দোহার সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেন গ্রাহকরা।
বিদ্যুতের দাবিতে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কও অবরোধ করা হয়। গতকাল রাত ১০টার দিকে হাইটেক পার্কের বর্ণী এলাকায় বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। শনিবার দিবাগত রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের বাইরে থাকা ৩৩ কেভি অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার বন্ধ করে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ঘটনায় পল্লী বিদ্যুতের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজশাহীর বাগমারার মচমৈল বাজার এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বের হওয়া পল্লী বিদ্যুতের একটি প্রচার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।
বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে না পেরে গতকাল শেরপুরের নকলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুতের ভারপ্রাপ্ত জিএম আখতারুজ্জামান বলেন, “প্রয়োজন ৭০ মেগাওয়াট। পাচ্ছি ৩৫ মেগাওয়াট। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের পুরো খেলার সময় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয়নি।”
দেশজুড়ে লোডশেডিং ও গ্রাহক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গতকাল জাতীয় সংসদে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বিধি ৩০০-এর আওতায় দেওয়া বিবৃতিতে তিনি জানান, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিকেজ ধরা পড়ায় সেটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ওই কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এ দুটি আকস্মিক ও কারিগরি কারণে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি এটিকে জাতীয় সংকট উল্লেখ করে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
চলতি মাসে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বড় একটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় এর প্রভাব বেশি। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। গরমের কারণে বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় এসি ও ফ্যানের ব্যবহারও বেড়েছে।
মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, রাত ১০টার পর সারা দেশে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়া শুরু হয়। আগে মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট কমে গেলেও এখন তা কমছে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট।
দ্বিতীয়ত, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচ রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে মধ্যরাতের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনার প্রচলিত ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখা যাচ্ছে না।
এ ছাড়া গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। বকেয়া বিলও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া থাকায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাওনা আটকে থাকায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
একই ধরনের চাপ রয়েছে আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। কয়েক বছর ধরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিল নিয়মিত পরিশোধ না হওয়ায় বর্তমানে পিডিবির মোট বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক দিন গ্যাসের ঘাটতির কারণে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হয়েছে। আগে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও গতকাল তা বাড়িয়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। এতে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট এখনো বন্ধ রয়েছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ের বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিস ও সাবস্টেশনসহ ১১টি স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানিও নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তির সবচেয়ে বড় উপায় বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমবে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসবে।



















