টাইমস্ অব ঢাকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসল প্রশাসন; ডিজিটাল সিন্ডিকেট ভাঙতে ফরেনসিক তদন্তের উদ্যোগ।
সওজে সবাই ‘সাধু’, টোল জালিয়াতির দায় নেবে কে? ফরেনসিক অডিটে যাচ্ছে সরকার
- Update Time : 02:58:19 pm, Monday, 11 May 2026
- / 225 Time View

টোল খাতে ডিজিটাল দুর্নীতি: আসছে ফরেনসিক তদন্ত ও অডিট
★সার্ট (CIRT) ও ফরেনসিক তদন্তের পরিকল্পনা
★প্রতিমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি: “ডিজিটাল চুরির সংস্কৃতি আর চলবে না”
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অন্দরে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। শত শত কোটি টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কন্ঠে কেবলই ‘অসহায়ত্ব’ আর ‘অজ্ঞতার’ সুর। দেশের ৬৭টি টোল প্লাজায় বসানো ডিজিটাল সিস্টেম এখন পরিণত হয়েছে ডিজিটাল ডাকাতির হাতিয়ারে। অথচ যাদের এই লুটতরাজ ঠেকানোর কথা, সেই সওজ কর্মকর্তারা এখন যেন একেকজন ‘পরম সাধু’। তাদের সাফ কথা— ‘আমরা কিছু জানি না, আমরা বুঝি না’। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের এই বিপুল রাজস্ব চুরির দায় নেবে কে?
ডিজিটাল পর্দার আড়ালে লুটপাটের মহোৎসব
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমের (ইটিসি) ছিদ্র দিয়ে প্রতি মিনিটে গায়েব হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। বছরে এই অংকটা প্রায় ৫০০ কোটি ছুঁইছুঁই। ‘ইউনিফাইড টোল সিস্টেম-ইউটিএস’ সার্ভারে লগইন করে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে ট্রানজেকশন ডাটা। নিয়ম অনুযায়ী সওজের নিজস্ব কর্মকর্তাদের এই সফটওয়্যার পরিচালনা করার কথা থাকলেও, কোনো চুক্তি ছাড়াই ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে সার্ভারে প্রবেশের একচ্ছত্র ক্ষমতা। আর এই সুযোগেই চলছে ডাটা ডিলিট আর টোলের টাকা পকেটে ভরার উৎসব।
‘আমি সিভিল বুঝি, সফটওয়্যার বুঝি না’
সওজের কর্মকর্তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এখন তুঙ্গে। যখন টোল প্লাজার দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অদ্ভুত সব যুক্তি দাঁড় করান।
সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট মো. আহসান হাবিব দায় এড়িয়ে বলছেন, “আমি সিভিল বিষয়ে কাজ করি। সফটওয়্যারের বিষয়ে আমার তেমন জানা নেই।” পদাধিকার বলে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট হয়েও সফটওয়্যার না বোঝার এই অজুহাত মূলত দুর্নীতির পথকেই প্রশস্ত করছে।
প্রোগ্রামার পম্পা আক্তার সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের পক্ষে এতো মনিটরিং করা সম্ভব নয়।
কম্পিউটার সিস্টেম এনালিস্ট আল আমিনের বক্তব্য আরও ভয়াবহ। তিনি জানান, এক মাস পর ডাটা ডিলিট করে দেওয়া হয়। তথ্য সেভ রাখা সম্ভব না হলে দায় তাদের নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্য মুছে ফেলার এই সংস্কৃতিই মূলত প্রমাণ লোপাটের প্রধান হাতিয়ার।
আত্রাই টোল প্লাজা: জালিয়াতির একটি খণ্ডচিত্র
গত ২৫ ডিসেম্বর আত্রাই টোল প্লাজার ভিডিও ফুটেজ ও সার্ভার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। মাত্র ১০ মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, ১৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টির টোল আদায়ের অংক সার্ভারে কম দেখানো হয়েছে।
একটি হেভি ট্রাকের ১৫০ টাকা টোলের বিপরীতে এন্ট্রি দেওয়া হয়েছে কম।
মাইক্রোবাসের ৬০ টাকার টোল দেখানো হয়েছে ৩০ টাকা।
বড় বাসের ১৩৫ টাকার টোল সার্ভারে উঠেছে মাত্র ৬০ টাকা।
এই সামান্য সময়ের ব্যবধানেই ১৯০ টাকা পকেটস্থ করেছে চক্রটি। যা পুরো দেশের ৬৭টি প্লাজায় হিসাব করলে দৈনিক ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার রাজম্ব ফাঁকিতে দাঁড়ায়।
সিন্ডিকেটের নেপথ্যে যারা
অভিযোগের আঙুল সওজের সাবেক সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট কাজি সাইদা মমতাজসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দিকে। অভিযোগ আছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে এরা গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফয়জুল কবির খানও স্বীকার করেছেন যে, বিগত আমলে টোল নিয়োগ ও পরিচালনায় ব্যাপক কেলেঙ্কারি ঘটেছে।
সওজ কর্মকর্তাদের এই ‘জানিনা-বুঝিনা’ থিওরি মূলত দুর্নীতির ডিজিটাল ঢাল। একদিকে বেসরকারি কোম্পানি ‘রেগনাম’ বিনা চুক্তিতে সার্ভার নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে সওজের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। এই ডিজিটাল ডাকাতি বন্ধ না হলে দেশের সড়ক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব কেবল অসাধু কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিলাসিতার খোরাক হয়েই থাকবে। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—সওজে সবাই যদি ‘সাধু’ হন, তবে চোরটা আসলে কে?
টোল ব্যবস্থায় ডিজিটাল অনিয়মের অভিযোগ, আইটি অডিটে যাচ্ছে সরকার
দেশের বিভিন্ন টোল প্লাজায় ডিজিটাল দুর্নীতি অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে ‘ডিজিটাল লুটপাটের’ অভিযোগে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। দ্যা টাইমস অব ঢাকায় এ সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। বর্তমানে এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নজরদারি শুরু হয়েছে এবং অনিয়ম রুখতে পূর্ণাঙ্গ আইটি অডিট ও ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও আইটি অডিট
টোল প্লাজাগুলোর ডিজিটাল সিস্টেমে কারচুপি ও তথ্য গায়েবের অভিযোগ এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দিলারা বেগম বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা ধারাবাহিকভাবে এটি পর্যবেক্ষণ করছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ (এভিডেন্স) পাওয়া গেলে পুরো আইটি সিস্টেমের একটি পূর্ণাঙ্গ আইটি অডিট পরিচালনা করা হবে।”
সার্ট (CIRT) ও ফরেনসিক তদন্তের পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টোল আদায়ের সার্ভার থেকে তথ্য মুছে ফেলা বা ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে উচ্চতর তদন্তের প্রয়োজন। যুগ্ম সচিব আরও জানান, সম্ভাব্য ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল-এর অধীন ‘সার্ট’ (Computer Incident Response Team)-এর সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এই জটিল কারিগরি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি: “ডিজিটাল চুরির সংস্কৃতি আর চলবে না”
টোল ব্যবস্থাপনায় এই সুসংগঠিত দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব তাঁর কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, সরকার এই লুটপাটের শিকড় উপড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারের আমলে যে ডিজিটাল চুরির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা আর চলতে দেওয়া হবে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশে প্রত্যেককে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে আপস করার প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজস্ব ফাঁকির নেপথ্যে যে সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টোল প্লাজাগুলোতে ডিজিটাল ডেটাবেজ থেকে গাড়ির সংখ্যা গোপন করা এবং ম্যানুয়াল রসিদ দিয়ে সংগৃহীত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমেই এই ‘ডিজিটাল চুরির’ প্রকৃত চিত্র এবং এর পেছনের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং মন্ত্রণালয়ের আইটি অডিটের সিদ্ধান্তের পর টোল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি এখন আরও জোরালো হয়েছে। সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের প্রত্যাশা, ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত এই লুটপাট বন্ধ হবে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সঠিক রাজস্ব জমা পড়বে।















