বিটিআরসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে এমএফএস ওয়ালেটের সন্দেহজনক লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধ লোন অ্যাপের বিস্তার রোধ এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। আসিফুল হক ডিএফএস (DFS) ও সিবিএস (CBS) বিশেষজ্ঞ
ডিজিটাল মহাজনি ঋণের মরণফাঁদ: যুবসমাজ ও মধ্যবিত্ত বিপন্ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
- Update Time : 02:56:14 pm, Saturday, 30 May 2026
- / 32 Time View

বাংলাদেশকে বলা হয় ক্ষুদ্রঋণের সুতিকাগার বা মাতৃভূমি। গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো (এনজিও/এমএফআই)। বাংলাদেশে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি বিরল দৃষ্টান্ত। উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA)-এর মতো সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়াই সদস্যদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও আমানত সংগ্রহের আইনগত অনুমোদন এই খাতকে অনন্য করেছে।
মূলত, ক্ষুদ্রঋণ এমন একটি মানবিক ঋণব্যবস্থা, যেখানে কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই সমিতিভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করা হয়। বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ। এ খাতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কর্মী। দেশে বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে আনুমানিক ৬৮৫টি এবং সাময়িক সনদপ্রাপ্ত রয়েছে ৩৪৬টি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এমআরএ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১,০৩১টি।
গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে প্রাচীন মহাজনি সুদের নির্মম চক্র থেকে মুক্তি দেওয়া, সঞ্চয় গঠন, আর্থিক স্বাবলম্বিতা, শিক্ষা, সচেতনতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈধ ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে এই নিয়ন্ত্রিত ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশে এক ভয়াবহ ‘ডিজিটাল মহাজনি’ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত কিছু অসাধু চক্র সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনিবন্ধিত অনলাইনভিত্তিক লোন অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।
গুগল প্লে স্টোরে থাকা এসব অ্যাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তাৎক্ষণিক ঋণের প্রলোভন দেখায়। প্রাচীন আমলের রক্তচোষা মহাজনি সুদের মতোই এসব অ্যাপ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ সুদে ঋণ বিতরণ ও আদায় করছে। বহুল আলোচিত কিছু অবৈধ অ্যাপের মধ্যে রয়েছে—আস্থা লোন, আশা লোন, র্যাপিড ক্যাশ, ফিন ক্যাশ, পপ ক্যাশ, আমার টাকা, দোস্ত লোন, সুবিধা লোন এবং ঢাকা ফিন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব চক্র ডিজিটাল মাধ্যমে আদায়কৃত বিপুল অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এসব ঋণ প্রদানকারী অ্যাপ ও ওয়ালেট দেশের বাইরে বসে রিমোটলি পরিচালিত হচ্ছে, যা দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই অনিবন্ধিত ও অবৈধ অ্যাপগুলোর মূল লক্ষ্য গ্রাম ও মফস্বলের ডিজিটাল জ্ঞানে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের যুবসমাজ। সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগে অনেক তরুণ এই অর্থ অনলাইন জুয়া বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করছে। আবার কেউ কেউ জরুরি চিকিৎসা ব্যয় বা পারিবারিক প্রয়োজনে একবার ঋণ নিয়ে পরবর্তীতে ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ছে।
এ থেকে রেহাই পাচ্ছে না চাকরিজীবী নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারও। বর্তমান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মাসের মাঝামাঝি সময়েই অনেকের বেতন ফুরিয়ে যায়। ফলে সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য বাধ্য হয়ে তারা এই উচ্চ সুদের ডিজিটাল ঋণের আশ্রয় নিচ্ছে। পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ছবি, কন্টাক্ট লিস্ট ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বর্তমান যুগে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডিজিটাল ফাইন্যান্স এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর ব্যাপক বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ খাতকে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে ডিজিটাল জ্ঞানে পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার মানুষকে একটি নিরাপদ ও আইনসম্মত আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে দেশের ডাটা সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অবৈধ অ্যাপগুলো নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও অপব্যবহার করতে না পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্রঋণ খাতের ডিজিটালাইজেশন মানে শুধু আর্থিক হিসাব কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা নয়। প্রকৃত ডিজিটাল ফাইন্যান্স হতে পারে অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB) যাচাই করে নির্দিষ্ট এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে সরাসরি ঋণ বিতরণ ও কিস্তি সংগ্রহ করা।
ইতোমধ্যে দেশের অনেক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে আংশিকভাবে ঋণ আদায় শুরু করেছে। তবে এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস সেবার মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের জন্য ক্যাশ-আউট চার্জ সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করা হলে একটি গ্রাহকবান্ধব ও টেকসই ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ন্যানো লোন’ চালুর অনুমোদন দিয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বিশেষায়িত ‘ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ নীতিমালা’ প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল মহাজনির মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করা যাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
একই সঙ্গে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, বিটিআরসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে এমএফএস ওয়ালেটের সন্দেহজনক লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধ লোন অ্যাপের বিস্তার রোধ এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।
আসিফুল হক
ডিএফএস (DFS) ও সিবিএস (CBS) বিশেষজ্ঞ





















