Dhaka 1:02 am, Friday, 10 July 2026

অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধসে তিন দিনে ২২ জনের প্রাণহানি, কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ, সাজেকে আটকা পড়েছেন ৪৫০ পর্যটক

স্টাফ রিপোর্টার
  • Update Time : 05:40:05 am, Thursday, 9 July 2026
  • / 121 Time View

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা চার দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। এ সময় পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় গত তিন দিনে এ অঞ্চলের তিন জেলায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে গতকাল বুধবার সাত শিশু রয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে। রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, চট্টগ্রামে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়, আবার একেবারে স্বাভাবিকও নয়। কারণ, আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিনে প্রায় বৃষ্টি হয়নি। ফলে এখন একসঙ্গে এত বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বর্ষাকালে সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে এবং বর্তমানে তেমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরে চার দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও সকালে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এ বৃষ্টি আরও দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, এবার আষাঢ়ের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি। এখন সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ অতি বৃষ্টির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে গত ৪৩ বছরে এত বেশি বৃষ্টিপাত হয়নি। সে হিসাবে এবারের বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক বলা যায়।

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বর্ষার শুরুতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অনেক সময় নেওয়া হয় না। শুরু থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

অন্যদিকে আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বর্ষাকালে বাংলাদেশে এমনিতেই বৃষ্টি হয়। এ সময় উপকূলে বা উপকূলঘেঁষা এলাকায় লঘুচাপ সৃষ্টি হলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এবারও একই পরিস্থিতি হয়েছে।

তিন দিনে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে গত তিন দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার তিন জেলায় পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর আগে রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আটজন, জেলা সদরে একজন এবং পেকুয়ায় একজনসহ মোট ১০ জন মারা যান। সর্বশেষ গতকাল কক্সবাজারে পাঁচজন এবং চট্টগ্রামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরে মহিলা হেফজখানার (মাদ্রাসা) দেয়াল ও মাটিচাপায় পাঁচ ছাত্রী মারা গেছে। তাদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি সিরাজ আমিন জানান, নিহত চার ছাত্রী হলো ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উন্মে নেজাতুল (১৩) ও উন্মে সালমা (১২) এবং মো. ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে ভারী বর্ষণের সময় দেয়াল ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধারকাজে অংশ নেন। সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।

গুরুতর আহত তিন শিশু-কিশোরীকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলো ৩ নম্বর ক্যাম্পের দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা বেগম (৯), একই ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) এবং ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-৭ ব্লকের বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। গুরুতর আহত তিনজনকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পাহাড়ের খাদে নির্মিত একটি দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এদিকে চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল নয়টায় জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম মারা যায়। তার মা লামিয়া আক্তার আহত হন। দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়।

টানা দ্বিতীয় দিন জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম

টানা ভারী বৃষ্টিতে আগের দিনের মতো গতকালও নগরের কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিন পোলের মাথা, চান্দগাঁও, শমসেরপাড়া, খরমপাড়া, খাজা রোড, সুন্নিয়া মাদ্রাসা, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, উত্তর আগ্রাবাদ, রামপুরা, হালিশহর, আকবরশাহ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি ছিল।

ভারী বর্ষণের কারণে নগরের প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল কম ছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হননি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের রামপুরা এলাকায় সড়কে হাঁটুসমান পানি জমেছে। নিচতলার বাসা, আধাপাকা ঘর ও দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং ঘরের আসবাবপত্র ভিজে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে পানি জমে আছে ঘরে। বারবার পানি পরিষ্কার করতে হয়। আবার পানি উঠে যায়। কী যে কষ্ট হয়, তা বলার মতো নয়।’

নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন সড়কও হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সরকারি কমার্স কলেজের পাশের একটি খাবারের দোকানেও পানি জমে থাকলেও বিক্রি চলছিল।

দোকানি মো. রাশেদ বলেন, নালা-নর্দমা ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হলে এমন পরিস্থিতি হতো না। জলাবদ্ধতার কারণে লোকজন কম বের হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।

কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের প্রায় চার কিলোমিটার রেলপথ দুই দিন ধরে প্রায় দুই ফুট পানির নিচে রয়েছে। সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেললাইন ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।

রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ গতকাল সকালে ডুবে থাকা রেলপথ পরিদর্শন করেন। তিনি গ্যাংকারে করে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন এবং ভবিষ্যতে রেললাইন যাতে পানিতে তলিয়ে না যায়, সে জন্য এটি পাঁচ ফুট উঁচু করার ঘোষণা দেন।

এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে দোহাজারী-কক্সবাজার নির্মাণাধীন রেলপথের একটি অংশ বন্যার পানিতে ডুবে গিয়ে পাথর ও মাটি সরে রেললাইন বেঁকে যায়। পরে পানি নিষ্কাশনের জন্য নতুন সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ফেনী থেকে হাসানপুর পর্যন্ত রেললাইন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় চার দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে এবং প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কবে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

যাত্রা বাতিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার এক্সপ্রেসের যাত্রী সাদিয়া আফরিন। তিনি বলেন, স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারে যাচ্ছিলেন। সকালে যাত্রা বাতিলের কথা জানানো হয়। অথচ রেলপথ মঙ্গলবার দুপুরেই ডুবে যায়। ঢাকা থেকেই যাত্রা বাতিল করা হলে মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে হতো না। তাঁর দুই মেয়ে সমুদ্র দেখার আশা করেছিল, কিন্তু তা আর হলো না।

রেললাইন ডুবে যাওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক অলক পাল বলেন, রেললাইনগুলো যে উচ্চতায় থাকার কথা, সম্ভবত এখানে তা নেই। আশপাশের নিচু এলাকায় পানি জমে রেললাইনও তলিয়ে যাচ্ছে।

সাজেকে আটকা ৪৫০ পর্যটক

একটানা অতি ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু-সাজেক সড়কও তলিয়ে গেছে।

গতকাল সকালে মাচালং, বাঘাইহাটসহ কয়েকটি এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে ৪০০ পর্যটক আটকা পড়েন।

পরিস্থিতির কারণে মঙ্গলবার বিকেলে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আটকে পড়া পর্যটকদের গতকাল ফেরার কথা থাকলেও সড়ক ডুবে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটকদের বুধবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে দুর্ঘটনা এড়াতে মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।

পাঁচ জেলায় প্লাবিত জনপদ

চার দিনের টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রামের আট উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলায় হাজারো পরিবার পানিবন্দী হয়েছে এবং সড়ক ও জনপদ তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীতে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত। পাহাড়ধস, ভাঙন ও জলাবদ্ধতায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সাজেকে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং শত শত পর্যটক আটকা পড়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ফসল ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

 

সূত্র: প্রথম আলো

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধসে তিন দিনে ২২ জনের প্রাণহানি, কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ, সাজেকে আটকা পড়েছেন ৪৫০ পর্যটক

Update Time : 05:40:05 am, Thursday, 9 July 2026

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা চার দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। এ সময় পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় গত তিন দিনে এ অঞ্চলের তিন জেলায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে গতকাল বুধবার সাত শিশু রয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে। রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, চট্টগ্রামে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়, আবার একেবারে স্বাভাবিকও নয়। কারণ, আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিনে প্রায় বৃষ্টি হয়নি। ফলে এখন একসঙ্গে এত বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বর্ষাকালে সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে এবং বর্তমানে তেমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরে চার দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও সকালে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এ বৃষ্টি আরও দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, এবার আষাঢ়ের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি। এখন সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ অতি বৃষ্টির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে গত ৪৩ বছরে এত বেশি বৃষ্টিপাত হয়নি। সে হিসাবে এবারের বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক বলা যায়।

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বর্ষার শুরুতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অনেক সময় নেওয়া হয় না। শুরু থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

অন্যদিকে আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বর্ষাকালে বাংলাদেশে এমনিতেই বৃষ্টি হয়। এ সময় উপকূলে বা উপকূলঘেঁষা এলাকায় লঘুচাপ সৃষ্টি হলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এবারও একই পরিস্থিতি হয়েছে।

তিন দিনে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে গত তিন দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার তিন জেলায় পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর আগে রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আটজন, জেলা সদরে একজন এবং পেকুয়ায় একজনসহ মোট ১০ জন মারা যান। সর্বশেষ গতকাল কক্সবাজারে পাঁচজন এবং চট্টগ্রামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরে মহিলা হেফজখানার (মাদ্রাসা) দেয়াল ও মাটিচাপায় পাঁচ ছাত্রী মারা গেছে। তাদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি সিরাজ আমিন জানান, নিহত চার ছাত্রী হলো ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উন্মে নেজাতুল (১৩) ও উন্মে সালমা (১২) এবং মো. ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে ভারী বর্ষণের সময় দেয়াল ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধারকাজে অংশ নেন। সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।

গুরুতর আহত তিন শিশু-কিশোরীকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলো ৩ নম্বর ক্যাম্পের দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা বেগম (৯), একই ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) এবং ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-৭ ব্লকের বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। গুরুতর আহত তিনজনকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পাহাড়ের খাদে নির্মিত একটি দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এদিকে চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল নয়টায় জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম মারা যায়। তার মা লামিয়া আক্তার আহত হন। দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়।

টানা দ্বিতীয় দিন জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম

টানা ভারী বৃষ্টিতে আগের দিনের মতো গতকালও নগরের কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিন পোলের মাথা, চান্দগাঁও, শমসেরপাড়া, খরমপাড়া, খাজা রোড, সুন্নিয়া মাদ্রাসা, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, উত্তর আগ্রাবাদ, রামপুরা, হালিশহর, আকবরশাহ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি ছিল।

ভারী বর্ষণের কারণে নগরের প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল কম ছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হননি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের রামপুরা এলাকায় সড়কে হাঁটুসমান পানি জমেছে। নিচতলার বাসা, আধাপাকা ঘর ও দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং ঘরের আসবাবপত্র ভিজে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে পানি জমে আছে ঘরে। বারবার পানি পরিষ্কার করতে হয়। আবার পানি উঠে যায়। কী যে কষ্ট হয়, তা বলার মতো নয়।’

নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন সড়কও হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সরকারি কমার্স কলেজের পাশের একটি খাবারের দোকানেও পানি জমে থাকলেও বিক্রি চলছিল।

দোকানি মো. রাশেদ বলেন, নালা-নর্দমা ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হলে এমন পরিস্থিতি হতো না। জলাবদ্ধতার কারণে লোকজন কম বের হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।

কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের প্রায় চার কিলোমিটার রেলপথ দুই দিন ধরে প্রায় দুই ফুট পানির নিচে রয়েছে। সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেললাইন ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।

রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ গতকাল সকালে ডুবে থাকা রেলপথ পরিদর্শন করেন। তিনি গ্যাংকারে করে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন এবং ভবিষ্যতে রেললাইন যাতে পানিতে তলিয়ে না যায়, সে জন্য এটি পাঁচ ফুট উঁচু করার ঘোষণা দেন।

এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে দোহাজারী-কক্সবাজার নির্মাণাধীন রেলপথের একটি অংশ বন্যার পানিতে ডুবে গিয়ে পাথর ও মাটি সরে রেললাইন বেঁকে যায়। পরে পানি নিষ্কাশনের জন্য নতুন সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ফেনী থেকে হাসানপুর পর্যন্ত রেললাইন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় চার দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে এবং প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কবে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

যাত্রা বাতিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার এক্সপ্রেসের যাত্রী সাদিয়া আফরিন। তিনি বলেন, স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারে যাচ্ছিলেন। সকালে যাত্রা বাতিলের কথা জানানো হয়। অথচ রেলপথ মঙ্গলবার দুপুরেই ডুবে যায়। ঢাকা থেকেই যাত্রা বাতিল করা হলে মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে হতো না। তাঁর দুই মেয়ে সমুদ্র দেখার আশা করেছিল, কিন্তু তা আর হলো না।

রেললাইন ডুবে যাওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক অলক পাল বলেন, রেললাইনগুলো যে উচ্চতায় থাকার কথা, সম্ভবত এখানে তা নেই। আশপাশের নিচু এলাকায় পানি জমে রেললাইনও তলিয়ে যাচ্ছে।

সাজেকে আটকা ৪৫০ পর্যটক

একটানা অতি ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু-সাজেক সড়কও তলিয়ে গেছে।

গতকাল সকালে মাচালং, বাঘাইহাটসহ কয়েকটি এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে ৪০০ পর্যটক আটকা পড়েন।

পরিস্থিতির কারণে মঙ্গলবার বিকেলে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আটকে পড়া পর্যটকদের গতকাল ফেরার কথা থাকলেও সড়ক ডুবে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটকদের বুধবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে দুর্ঘটনা এড়াতে মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।

পাঁচ জেলায় প্লাবিত জনপদ

চার দিনের টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রামের আট উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলায় হাজারো পরিবার পানিবন্দী হয়েছে এবং সড়ক ও জনপদ তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীতে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত। পাহাড়ধস, ভাঙন ও জলাবদ্ধতায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সাজেকে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং শত শত পর্যটক আটকা পড়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ফসল ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

 

সূত্র: প্রথম আলো