Dhaka 3:44 pm, Sunday, 21 June 2026

এবার ‘মহাকাশের ঘ্রাণ’ দিয়ে তৈরি হবে পারফিউম – পোড়া মাংস, গরম ধাতু আর মিষ্টি রাসবেরির মিশেলে বোতলজাত হচ্ছে নতুন এই সুবাস

নিজস্ব প্রতিবেদন
  • Update Time : 06:44:08 am, Sunday, 21 June 2026
  • / 39 Time View

মহাকাশ কেমন- এই প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত সীমাহীন অন্ধকার, নক্ষত্র আর এক ধরনের শূন্যতার কথা মনে আসে। তবে মহাকাশের গন্ধ কেমন- এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই বিস্ময়কর হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশের একটি স্বতন্ত্র ঘ্রাণ রয়েছে, যা অনেকটা পোড়া মাংস, গরম ধাতু, ওয়েল্ডিংয়ের ধোঁয়া এবং মিষ্টি রাসবেরির মিশ্রণের মতো। মহাকাশচারীদের বর্ণনা করা এই গন্ধকে কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করে পারফিউমে রূপ দিয়েছেন এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ।

মহাকাশ মূলত একটি ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য পরিবেশ, ফলে সেখানে সরাসরি কোনো গন্ধ অনুভব করা সম্ভব নয়। তবে স্পেসওয়াক শেষে নভোচারীরা যখন মহাকাশযানে ফিরে আসেন, তখন এ অভিজ্ঞতা ঘটে। এয়ারলকের চাপ স্বাভাবিক হওয়ার পর নভোচারীদের স্যুট, গ্লাভস ও অন্যান্য সরঞ্জামে লেগে থাকা রাসায়নিক কণা যানের ভেতরের বাতাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি বিশেষ গন্ধ তৈরি করে।

নাসার নভোচারী ডন পেটিট এ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, “এই গন্ধের বর্ণনা দেওয়া সত্যি কঠিন। এটি এমন কোনো সাধারণ খাবারের মতো নয় যে চট করে বলে দেওয়া যাবে এটির স্বাদ মুরগির মাংসের মতো। আমি সবচেয়ে কাছাকাছি এমন বর্ণনাটি দিতে পারি তা হলো, এটি একটি বেশ চমৎকার মিষ্টি ধাতব অনুভূতি। এটি আমাকে আমার কলেজের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আমি একটি আউটফিটের ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য আর্ক ওয়েল্ডিং টর্চ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতাম। মহাকাশের গন্ধটি ঠিক সেই ওয়েল্ডিংয়ের মিষ্টি ধোঁয়ার মতো।”

ভবিষ্যৎ মিশনের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত করতে নাসা এমন একটি গন্ধ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়, যা প্রশিক্ষণের সময় মহাকাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এই কাজের দায়িত্ব পান ব্রিটিশ সুগন্ধি রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্স। নভোচারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাকাশের গন্ধে বারুদ, পোড়া স্টেক, রাসবেরি এবং রাম নামের একধরনের অ্যালকোহলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মহাকাশ থেকে সরাসরি কোনো গন্ধের নমুনা আনা সম্ভব না হওয়ায় তাকে সম্পূর্ণভাবে নভোচারীদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কয়েক বছরের প্রচেষ্টার পর তিনি ধাতব, ধোঁয়াটে, পোড়া এবং হালকা মিষ্টি ঘ্রাণের সমন্বয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করেন। প্রথমে এটি নাসার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য তৈরি হলেও পরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে বাণিজ্যিকভাবেও বাজারজাত করা হয়।

মহাকাশের গন্ধকে রাসবেরি বা বারবিকিউর সঙ্গে তুলনা করার পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। স্পেনের আইআরএএম ৩০-মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের স্যাজিটেরিয়াস বি২ নামের একটি বিশাল আণবিক ধূলিমেঘে ইথাইল ফরমেট নামের যৌগের সন্ধান পেয়েছেন। পৃথিবীতে এই যৌগ রাসবেরির ঘ্রাণ ও ফলের স্বাদের জন্য দায়ী।

এ ছাড়া মহাজাগতিক মেঘে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামের কার্বনসমৃদ্ধ যৌগও ব্যাপকভাবে উপস্থিত। এই যৌগ স্পেসক্রাফটের উপাদান ও উচ্চশক্তির কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এমন অনুভূতি তৈরি করে, যা পৃথিবীতে পোড়া খাবার, ধোঁয়া বা চারকোল পোড়ার গন্ধের সঙ্গে মিল রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশের এই ঘ্রাণ কোনো একক রাসায়নিক উৎস থেকে আসে না। এটি মূলত মহাকাশের তীব্র পরিবেশ, তেজস্ক্রিয় কণা এবং স্পেসস্যুটের উপাদানের মধ্যে সংঘটিত জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্সের এই পুনর্নির্মাণ সাধারণ মানুষকে পৃথিবীতে বসেই দূর মহাকাশের একটি অনুভূতির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

এবার ‘মহাকাশের ঘ্রাণ’ দিয়ে তৈরি হবে পারফিউম – পোড়া মাংস, গরম ধাতু আর মিষ্টি রাসবেরির মিশেলে বোতলজাত হচ্ছে নতুন এই সুবাস

Update Time : 06:44:08 am, Sunday, 21 June 2026

মহাকাশ কেমন- এই প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত সীমাহীন অন্ধকার, নক্ষত্র আর এক ধরনের শূন্যতার কথা মনে আসে। তবে মহাকাশের গন্ধ কেমন- এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই বিস্ময়কর হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশের একটি স্বতন্ত্র ঘ্রাণ রয়েছে, যা অনেকটা পোড়া মাংস, গরম ধাতু, ওয়েল্ডিংয়ের ধোঁয়া এবং মিষ্টি রাসবেরির মিশ্রণের মতো। মহাকাশচারীদের বর্ণনা করা এই গন্ধকে কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করে পারফিউমে রূপ দিয়েছেন এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ।

মহাকাশ মূলত একটি ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য পরিবেশ, ফলে সেখানে সরাসরি কোনো গন্ধ অনুভব করা সম্ভব নয়। তবে স্পেসওয়াক শেষে নভোচারীরা যখন মহাকাশযানে ফিরে আসেন, তখন এ অভিজ্ঞতা ঘটে। এয়ারলকের চাপ স্বাভাবিক হওয়ার পর নভোচারীদের স্যুট, গ্লাভস ও অন্যান্য সরঞ্জামে লেগে থাকা রাসায়নিক কণা যানের ভেতরের বাতাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি বিশেষ গন্ধ তৈরি করে।

নাসার নভোচারী ডন পেটিট এ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, “এই গন্ধের বর্ণনা দেওয়া সত্যি কঠিন। এটি এমন কোনো সাধারণ খাবারের মতো নয় যে চট করে বলে দেওয়া যাবে এটির স্বাদ মুরগির মাংসের মতো। আমি সবচেয়ে কাছাকাছি এমন বর্ণনাটি দিতে পারি তা হলো, এটি একটি বেশ চমৎকার মিষ্টি ধাতব অনুভূতি। এটি আমাকে আমার কলেজের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আমি একটি আউটফিটের ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য আর্ক ওয়েল্ডিং টর্চ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতাম। মহাকাশের গন্ধটি ঠিক সেই ওয়েল্ডিংয়ের মিষ্টি ধোঁয়ার মতো।”

ভবিষ্যৎ মিশনের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত করতে নাসা এমন একটি গন্ধ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়, যা প্রশিক্ষণের সময় মহাকাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এই কাজের দায়িত্ব পান ব্রিটিশ সুগন্ধি রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্স। নভোচারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাকাশের গন্ধে বারুদ, পোড়া স্টেক, রাসবেরি এবং রাম নামের একধরনের অ্যালকোহলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মহাকাশ থেকে সরাসরি কোনো গন্ধের নমুনা আনা সম্ভব না হওয়ায় তাকে সম্পূর্ণভাবে নভোচারীদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কয়েক বছরের প্রচেষ্টার পর তিনি ধাতব, ধোঁয়াটে, পোড়া এবং হালকা মিষ্টি ঘ্রাণের সমন্বয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করেন। প্রথমে এটি নাসার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য তৈরি হলেও পরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে বাণিজ্যিকভাবেও বাজারজাত করা হয়।

মহাকাশের গন্ধকে রাসবেরি বা বারবিকিউর সঙ্গে তুলনা করার পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। স্পেনের আইআরএএম ৩০-মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের স্যাজিটেরিয়াস বি২ নামের একটি বিশাল আণবিক ধূলিমেঘে ইথাইল ফরমেট নামের যৌগের সন্ধান পেয়েছেন। পৃথিবীতে এই যৌগ রাসবেরির ঘ্রাণ ও ফলের স্বাদের জন্য দায়ী।

এ ছাড়া মহাজাগতিক মেঘে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামের কার্বনসমৃদ্ধ যৌগও ব্যাপকভাবে উপস্থিত। এই যৌগ স্পেসক্রাফটের উপাদান ও উচ্চশক্তির কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এমন অনুভূতি তৈরি করে, যা পৃথিবীতে পোড়া খাবার, ধোঁয়া বা চারকোল পোড়ার গন্ধের সঙ্গে মিল রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশের এই ঘ্রাণ কোনো একক রাসায়নিক উৎস থেকে আসে না। এটি মূলত মহাকাশের তীব্র পরিবেশ, তেজস্ক্রিয় কণা এবং স্পেসস্যুটের উপাদানের মধ্যে সংঘটিত জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল। রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্সের এই পুনর্নির্মাণ সাধারণ মানুষকে পৃথিবীতে বসেই দূর মহাকাশের একটি অনুভূতির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।