১৯ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ডিঙিয়ে একরামুল হককে করা হলো বুয়েটের ভিসি, এর আগে কখনো বিভাগীয় প্রধানও ছিলেন না
- Update Time : 07:25:12 am, Tuesday, 19 May 2026
- / 43 Time View

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) একটি বড় অংশ এখন পদ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এরই মধ্যে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার শিক্ষকরা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের অনেকের প্রতি সরকার আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে দলীয় বিবেচনায় নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ নানা অসংগতির অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকার বদলালেও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।
গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি এর আগে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বিএনপিসমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সভাপতি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। বাগেরহাট-৪ আসনে দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আলোচনাতেও ছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির দুবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান, যিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম চবি শাখার সাবেক সহসভাপতি।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য হয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের কার্যনির্বাহী সদস্য। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মামুন আহমেদকে ইউজিসির চেয়ারম্যান করা হয়। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি জাসাসের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আব্দুস সালাম। তিনি সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রোভিসি (প্রশাসন) হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য হয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি ঢাবির সাদা দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং শিক্ষক সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন।
এভাবে দেখা গেছে, বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রায় সব উপাচার্যই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বিএনপির শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সার্চ কমিটির সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অব্যাহতি পাওয়া ২০ উপাচার্যের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত শিক্ষকও রয়েছেন, যাদের বেশির ভাগ জামায়াতপন্থি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। বিএনপিপন্থি পরিচয় থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন উপাচার্য ইতোমধ্যে পদ হারিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের খারাপ ফল, প্রশাসনিক নিয়োগে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের প্রাধান্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্যাম্পাস অস্থিরতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ সামাল দিতে ব্যর্থতার কথা বলা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমার ওপর শিবির-এনসিপি সমর্থিতদের নিয়োগ দেওয়ার চাপ ছিল। কিন্তু আমি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখি। একজনকেও নিয়োগ দিইনি। তারপরও এখন পদ হারানোর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক গত রোববার একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, আরও পরিবর্তন আসবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে, ‘হ্যাঁ।’ কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার যেখানে প্রয়োজন মনে করবে।
সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে গত মাসে ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি আবদুল খালেক। সদস্যদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান (পরে পদত্যাগ করেছেন), অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান এবং সদস্য সচিব হিসেবে আছেন অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে। সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘এটি খুব দুর্ভাগ্যজনক যে, বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা দলীয়করণের ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।’
তিনি বলেন, যতদিন ভিসি ও প্রোভিসিরা শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের প্রধান থাকবেন এবং তাদের নিয়োগে রাজনীতি থাকবে, ততদিন শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ হবে না। তার মতে, উচ্চশিক্ষা কমিশনের অধীনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেন, ‘রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের অযোগ্যতা?’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য হিসেবে পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. একরামুল হককে নিয়োগ দেওয়ার পর সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাকে নিয়োগ দিতে গিয়ে ১৯ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ডিঙানো হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, তিনি আগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করা হয়। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা নুরুজ্জামান আহমেদের আত্মীয় হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া। তার বিরুদ্ধে নারীশিক্ষার্থী নিপীড়ন, মানসিক নির্যাতন ও গবেষণাপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত চলমান থাকলেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম শহীদুল ইসলাম। যদিও সংশ্লিষ্ট আইনে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ’ ব্যক্তিকে উপাচার্য করার কথা বলা হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ। তিনি আগে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং আন্দোলনের মুখে সেই পদ হারান। ডুয়েটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে উপাচার্য নিয়োগের পর আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষককেই উপাচার্য করতে হবে। আন্দোলন পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন।
দীর্ঘদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রাধান্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক নিয়োগে সেই ধারা কমেছে। সর্বশেষ ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র দুটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও পেশাগত বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় থাকায় এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।




















