কালের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা: গৌরবময় অতীত থেকে বিষাক্ত বর্তমানের করুণ আখ্যান
- Update Time : 06:39:54 am, Wednesday, 2 September 2026
- / 74 Time View

বুড়িগঙ্গা—এটি শুধু একটি নদী নয়, ঢাকার প্রাণ এবং গড়ে ওঠার মূল চালিকাশক্তি। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শহরটিকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে এই নদী, আজ এটি মানুষের নির্মমতার শিকার হয়ে এক মৃতপ্রায় নর্দমায় পরিণত হয়েছে। একসময়ের রুপালি জলের এই নদী কীভাবে আজ আলকাতরার মতো কালো আর দুর্গন্ধময় হয়ে উঠল, তা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর সুদূর অতীতে। বুড়িগঙ্গার আদি ইতিহাস, এর রূপবদল এবং বর্তমানের করুণ দশা নিয়ে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদন।
ঐতিহাসিক তথ্য ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীনকালে বুড়িগঙ্গা মূলত গঙ্গা নদীর একটি প্রধান ধারা ছিল। কালক্রমে গঙ্গা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করলে এই ধারাটি ধলেশ্বরী নদীর সাথে যুক্ত হয় এবং একটি স্বতন্ত্র নদী হিসেবে প্রবাহিত হতে থাকে। গঙ্গার পুরনো বা বুড়ো ধারা থেকে এই নদীর উৎপত্তি বলেই এর নাম হয় ‘বুড়িগঙ্গা’। অন্য একটি লোককথা প্রচলিত আছে যে, চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যের তরী এই নদী দিয়ে যাতায়াত করত এবং তিনি এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এর নামকরণ করেছিলেন। মোঘল আমলে ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান যখন ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন বুড়িগঙ্গার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। নদীর তীর ঘেঁষেই গড়ে ওঠে লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিলসহ মোঘল ও ব্রিটিশ আমলের অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা।
একসময়ের প্রমত্তা ও রূপবতী বুড়িগঙ্গা
অতীতের বুড়িগঙ্গা ছিল এক প্রমত্তা, চোখ জুড়ানো নদী। মোঘল ও ইউরোপীয় পর্যটকদের বিভিন্ন ভ্রমণকাহিনীতে বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্যের ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া যায়। ফরাসি পর্যটক তাভার্নিয়ে কিংবা ব্রিটিশ আমলের নথিপত্রে বুড়িগঙ্গাকে ভেনিসের খালের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তখন এই নদীর পানি এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে, নদীর তলদেশ পর্যন্ত দেখা যেত। ঢাকার মানুষ পান করা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন সব কাজে এই নদীর পানি ব্যবহার করত। ইলিশসহ হরেক রকমের সুস্বাদু মাছের ভাণ্ডার ছিল এই নদী। পাল তোলা নৌকা, বজরা আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাণিজ্যিক জাহাজের আনাগোনায় বুড়িগঙ্গা সবসময় মুখরিত থাকত। ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সদরঘাট, যা আজ অব্দি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর।
যেভাবে শুরু হলো বিপর্যয় ও দূষণ
বুড়িগঙ্গার এই গৌরবময় দিনগুলো চিরস্থায়ী হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঢাকার জনসংখ্যা তীব্র গতিতে বাড়তে শুরু করে এবং একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শিল্পায়ন। এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নই বুড়িগঙ্গার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে হাজারীবাগের চামড়া শিল্প বা ট্যানারি কারখানাগুলো কয়েক দশক ধরে বুড়িগঙ্গার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য, ক্রোমিয়াম, সিসা সরাসরি বুড়িগঙ্গার পানিতে গিয়ে মিশেছে। এর পাশাপাশি বুড়িগঙ্গার দুই তীরে গড়ে ওঠা শত শত ডাইং কারখানা, ওয়াশিং প্ল্যান্ট এবং প্লাস্টিক কারখানার কেমিক্যালযুক্ত রঙিন পানি নদীটিকে পুরোপুরি বিষাক্ত করে তোলে।
পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনার ভাগাড়
শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি ঢাকার কোটিরও বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানির মান ধ্বংস করেছে। ঢাকার সুয়ারেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের সিংহভাগেরই শেষ গন্তব্য এই বুড়িগঙ্গা নদী। প্রতিদিন লাখ লাখ গ্যালন অপরিশোধিত মানববর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। এছাড়াও সদরঘাট দিয়ে যাতায়াত করা শত শত লঞ্চ, স্টিমার ও কার্গো জাহাজ থেকে পোড়া মবিল, তেল এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়মিত পানিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীটি এখন আর কোনো প্রাকৃতিক জলাশয় নয়, বরং ঢাকা শহরের একটি উন্মুক্ত ডাস্টবিন বা বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
দখলদারিত্বের থাবায় সংকুচিত নদী
বুড়িগঙ্গার শুধু পানিই নষ্ট হয়নি, এর অস্তিত্বও আজ সংকটের মুখে। একশ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও স্থানীয় দখলদারদের থাবায় নদীর দুই পাড় ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে। নদীর বুক ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, কারখানা, ঘাট এবং বাজার। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই নদী আবার বেদখল হয়ে যায়। নদীর সীমানা পিলার নিয়ে নানা বিতর্ক এবং সঠিক তদারকির অভাবে বুড়িগঙ্গা তার আদি প্রশস্ততা হারিয়ে এখন একটি সরু খালে রূপ নিতে চলেছে। নদীর তলদেশে জমেছে প্লাস্টিক ও পলিথিনের কয়েক ফুটের পুরু স্তর, যার কারণে নদীর স্বাভাবিক পানির প্রবাহ এবং নাব্যতা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।
জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ও পরিবেশগত বিপর্যয়
আজকের বুড়িগঙ্গা সম্পূর্ণভাবে একটি মৃত নদী। বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো পানিতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে অন্তত ৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) থাকা প্রয়োজন। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এর ফলে নদী থেকে মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপসহ সব ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানি কুচকুচে কালো ও ঘন হয়ে যায় এবং এর থেকে নির্গত তীব্র পচা দুর্গন্ধ আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার বাতাস দূষিত করে তোলে। নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে চর্মরোগ, জন্ডিস, ডায়রিয়াসহ নানা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিনিয়ত দেখা দিচ্ছে।
উদ্ধারের প্রচেষ্তা ও বর্তমান বাস্তবতা
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। উচ্চ আদালত বুড়িগঙ্গাকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে এর সুরক














