রক্ষণশীল ও ডানপন্থীদের পছন্দের খেলোয়াড় রোনালদো, লিবারেলদের মেসি— বলছে ১০ হাজার মানুষের ওপর চালানো গবেষণা
- Update Time : 11:12:19 pm, Wednesday, 24 June 2026
- / 24 Time View

মেসি না রোনালদো? ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের ও বিতর্কিত আলোচনাগুলোর একটি এটি। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এই দুই তারকাকে ঘিরে অসংখ্য আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তবে এই পছন্দ কি শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে, নাকি এর পেছনে মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রভাব রয়েছে?
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। বিশ্বের ২৬টি দেশের ১০ হাজার ৬৬১ জন মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে সমর্থকদের পছন্দের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, যারা নিজেদের উদারপন্থী (লিবারেল) হিসেবে মনে করেন, তাদের বড় একটি অংশ মেসির প্রতি বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) মতাদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে রোনালদোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলক বেশি।
গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে দুই খেলোয়াড়ের জনমানসে তৈরি হওয়া আলাদা ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেসিকে সাধারণত শান্ত, বিনয়ী এবং দলগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া একজন খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে রোনালদোকে আত্মবিশ্বাসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নিজের অর্জন প্রকাশ্যে উদযাপন করতে পছন্দ করেন এমন একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ সাধারণত এমন ব্যক্তিত্বের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, যাদের প্রকাশ্য ভাবমূর্তি তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও সামাজিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিল থাকে।
দেশভিত্তিক জনপ্রিয়তার হিসাবেও ভিন্নতা দেখা গেছে। ফ্রান্স ও চীনসহ ১১টি দেশে রোনালদো জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৮টি দেশে মেসির প্রতি সমর্থন বেশি। জার্মানি, জাপানসহ সাতটি দেশে দুই খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তার মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সামগ্রিক জনপ্রিয়তার দিক থেকে মেসি রোনালদোর চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব তরুণদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কমে আসে। এছাড়া যাদের আত্মসম্মানবোধ বা ‘সেলফ এস্টিম’ বেশি, তাদের মধ্যে রোনালদোর প্রতি আগ্রহও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ মুখে বিনয়কে প্রশংসা করলেও বাস্তবে অনেকেই এমন ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হন, যারা নিজেদের সক্ষমতা ও সাফল্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করেন। উচ্চ আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা অনেক সময় এমন তারকাদের সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখতে চান এবং সেখান থেকে মানসিক তৃপ্তি পান।
ফলে মেসি ও রোনালদো এখন শুধু দুই ফুটবলারের নাম নয়। অনেকের কাছে তারা ব্যক্তিগত দর্শন, মূল্যবোধ ও জীবনধারার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। একজনকে দলগত সাফল্য ও বিনয়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, অন্যজনকে ব্যক্তিগত সাফল্য, আত্মবিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়।
চলমান বিশ্বকাপ হয়তো এই দুই কিংবদন্তির শেষ বিশ্বমঞ্চ হতে পারে। তবে তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, আবেগ ও মানসিক বিভাজন ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় আরও বহু বছর থাকবে।
তাই বিষয়টি শুধু ‘কে সেরা’—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। আর এ কারণেই মেসি বনাম রোনালদো বিতর্কের শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।























