Dhaka 7:26 am, Tuesday, 21 July 2026

মেসি যুগের সূর্যাস্ত, ইয়ামাল যুগের সূর্যোদয়

খেলা ডেস্ক
  • Update Time : 05:42:52 am, Monday, 20 July 2026
  • / 26 Time View
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান। দীর্ঘ ১৬ বছর আর চারটা বিশ্বকাপ পেরিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে স্পেন। বিশ্বকাপের ট্রফিটা আর লাতিন আমেরিকায় থাকল না। ফিরল ইউরোপে। ফিরল স্পেনে। ফিরল ফুটবলের ধাত্রীভূমিতে। তবে জয় হয়েছে সুন্দর ফুটবলের।

যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮২ হাজার দর্শকের সামনে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দলটাই জিতল। জিতল ফুটবল নিজেই। স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে স্পেন ১ আর আর্জেন্টিনা ০। কিন্তু স্কোরবোর্ডে কখনো পুরো দৃশ্যপট ফুটে উঠে না। এই ম্যাচে স্পেন ইয়োহান ক্রুইফের ফুটবল দর্শন ‘টিকিটাকা’ দিয়ে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে যেভাবে ফালা ফালা করে দিয়েছে, তা ছিল অকল্পনীয়।

‘লা আলবিসেলেস্তে’কে এদিন যেন মাঠে নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে। প্রতিটি ম্যাচ দাপটের সঙ্গে খেলে, আসল ম্যাচেই লিওনেল মেসির দল কেন যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে।

এই বিশ্বকাপটা স্পেনের জন্য শুধু একটা ট্রফি না, এটা ছিল একটা জবাব। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০১৮ তে রাশিয়ায় স্বাগতিক রাশিয়ার কাছেই টাইব্রেকারে হার, ২০২২ এ মরক্কোর কাছে একইভাবে হার। প্রতিবারই তাদের শুনতে হয়েছে, টিকিটাকা শেষ, স্পেন শেষ। পাস পাস করে গোল হয় না।

ফুটবল এখন ফিজিক্যাল, ফুটবল এখন গতির। আর সেই সব সমালোচনার জবাব স্পেন দিলো মাঠেই, তাদের নিজেদের ভাষায়, পাস দিয়ে। দেখাল পাসের নান্দনিক এক প্রদর্শনী। এই জয়টা ফুটবল কোচিং-এর জন্য একটা বার্তা।

যখন পুরো বিশ্ব ফিজিক্যাল ফুটবল, লং বল আর কাউন্টার অ্যাটাকের দিকে ঝুঁকছে, তখন স্পেন দেখাল পাসিং ফুটবল দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায়, যদি সেই পাসিংয়ে উদ্দেশ্য থাকে।

এবারের স্পেন ২০১০ এর স্পেন নয়। সেই স্পেন ছিল ধীর, নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর ছুরি চালানো। জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সার্জিও বুসকেটস, জাবি আলোনসোরা বলকে বন্দি করে রাখতেন, প্রতিপক্ষ দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে গোল করতেন।

আর এবারের স্পেন হলো বিদ্যুতের মতো। সেই পাসিং দর্শন আছে, কিন্তু তার সাথে যোগ হয়েছে ধারালো ছুরি। লুইস দে লা ফুয়েন্তে যা করেছেন, তা কোনো বড় কোচ করেননি। তার হাতে বড় কোনো নাম ছিল না। তিনি করেছেন সবচেয়ে কঠিন কাজটা, লা মাসিয়া আর বাস্ক অঞ্চলের একাডেমির ছেলেদের বিশ্বাস করেছেন।

বার্সেলোনা, রিয়াল সোসিয়েদাদ, অ্যাথলেটিক বিলবাও-এর ছেলেদের দিয়ে একটা পরিবার বানিয়েছেন। এই দলে কোনো সুপারস্টারের ইগো ছিল না, আছে শুধু একটা সিস্টেমের প্রতি ভালোবাসা।

এই স্পেনে আছেন লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, নিকো উইলিয়ামস, মিকেল ওইয়ারসাবাল, ফেরান তোরেসরা। বল পায়ে তারা খুব দ্রুত নিজেদের বক্স থেকে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছে যান। তাদের টিকিটাকা যে এত নিখুঁত হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। যেন স্কেল দিয়ে মাপা। প্রতিটা মুভমেন্ট ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলনের ফল, তা না বোঝার কোনো কারণ নেই।

এই জয়টা লা লিগারও জয়। যখন সবাই ভাবছিল প্রিমিয়ার লিগই সব। লা লিগা শেষ। টাকা নেই। তারকা নেই। তখন স্পেনের খেলোয়াড়রা দেখালেন, তাদের ঘরোয়া লিগ এখনো বিশ্বের সেরা ট্যালেন্ট তৈরি করে।

যখন পুরো বিশ্ব ফিজিক্যাল ফুটবল, লং বল আর কাউন্টার অ্যাটাকের দিকে ঝুঁকছে, তখন স্পেন দেখাল পাসিং ফুটবল দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায়, যদি সেই পাসিংয়ে দক্ষতা থাকে।

ফাইনালের রাতটা ছিল ফুটবলের দুই দর্শনের লড়াই। একদিকে স্পেনের ৬৮ শতাংশ বল দখল, ৮০৩টা পাসের ফুল ফোটানো ফুটবল।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার রাফ ফুটবল, যেখানে সৌন্দর্য থামাতে ফাউলই ছিল প্রধান অস্ত্র। যতটা না পজিটিভ ফুটবল খেলেছে, তার চেয়ে বেশি খেলেছে নেগেটিভ ফুটবল। সত্যি বলতে, আর্জেন্টিনা এদিন পাত্তাই পায়নি। অনেক বেশি গোলে হারলে অবাক হওয়ার থাকতো না। এ ম্যাচে তারা জিতলে স্পেনের প্রতি অবিচার হতো।

প্রথমার্ধ থেকেই স্পেন আর্জেন্টিনাকে তাদের নিজেদের অর্ধেই আটকে রেখেছিল। মেসি একা আর কী করবেন? যৌবনের সেই দিন তো আর নেই। মাঝমাঠে পেদ্রি আর রদ্রি তাকে ঘিরে রেখেছিলেন। আর্জেন্টিনা বারবার খেলার ছন্দ নষ্ট করেছে, ট্যাকলে ট্যাকলে ভরিয়ে দিয়েছে ম্যাচ।

রেফারিকে বাধ্য হয়ে কার্ড বের করতে হয়েছে। তাদের দেখাতে হয়েছে পাঁচটি হলুদ কার্ড। এক পর্যায়ে ১০ জনে পরিণত হয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। তারা ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে, কিন্তু জিততে পারেনি।

৯০ মিনিট গোলশূন্য। অতিরিক্ত সময়ে যখন সবাই টাইব্রেকারের প্রহর গুনছে, তখনই এলো সেই মুহূর্ত। ৯৮ মিনিটে পেদ্রির বাড়ানো থ্রু বল, ইয়ামাল ডান দিক থেকে ভেতরে কেটে ঢুকে ডিফেন্সকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেন আর বক্সে ফাঁকায় দাঁড়ানো ফেরান তোরেস ঠান্ডা মাথায় বাঁ পায়ের ফিনিশে গোল। বেঞ্চ থেকে উঠে এসে বিশ্বকাপ জেতানো গোল। স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে এই গোলটা নিঃসন্দেহে অমূল্য হয়ে থাকবে।

শেষ বাঁশিটা বাজলো। মেটলাইফের আকাশে আতশবাজি, লাল-হলুদ উৎসব। আর মাঝমাঠে একা দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। চোখ বেয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। এটা খুবই স্বাভাবিক।

গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর অনেক মুকুট মাথায় থাকলেও বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে যাওয়ার কষ্ট মেনে নেওয়া সহজ নয়। সামনে ছিল অনেক বড় ইতিহাস গড়ার হাতছানি।

এই দৃশ্যটা তার অনুরাগীরা দেখতে চায়নি। ৩৯ বছরের মেসির জার্সিটা ঘামে ভেজা, হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, হাত নেড়ে অশ্রুভেজা চোখে বিদায় জানাচ্ছেন। পুরো স্টেডিয়াম, এমনকি স্পেনের সমর্থকরাও উঠে দাঁড়ালেন। চোখে পানি নিয়ে করতালি। ২০টা বছর ধরে ফুটবলকে আরাধনার মতো করে তুলেছিলেন।

২০২২ এর হাসি আর ২০২৬ এর কান্না দিয়ে বিদায় নিতে হলো। ফুটবল তাকে সব দিয়েছে, তিনিও ফুটবলকে দিতে কার্পণ্য করেননি। বিদায়ী মুহূর্তে আজ আর তার কিছু চাওয়ার নেই, দেওয়ারও নেই। মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ উদ্দেশ্যবিহীন তাকিয়ে থাকেন। সেই অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

এটা শুধু আর্জেন্টিনা বা বিশ্ব ফুটবলের এক মহানায়কের বিদায় নয়, এটা গৌরবময় এক অধ্যায়ের অবসান। যারা মেসির ড্রিবলে দেখে বড় হয়েছেন, তার ফ্রি কিকে আনন্দিত হয়েছেন, তাদের কাছে এটা বড় কষ্টের।

একটা পর্যায়ে, অন্য প্রান্ত থেকে দৌড়ে মাঠে আসেন ১৯ বছরের একটা ছেলে। পিঠে ১৯ নম্বর জার্সি। লামিন ইয়ামাল। চোখে আগুন, মুখে শিশুর হাসি। আবেগে জড়িয়ে ধরেন মেসিকে। মুখে বিষণ্নতা থাকলেও যোগ্য উত্তরসূরিকে বুকের উষ্ণতায় অভিবাদন জানালেন মেসি। সম্ভবত মনে মনে আশীর্বাদও করেন।

ফুটবল কখনো কখনো ভবিষ্যৎ আগেই লিখে রাখে। ২০০৭ সালে মেসির বয়স তখন ২০, সদ্য বার্সেলোনায় নিজের জায়গা পাকা করছেন। বার্সেলোনার পক্ষ থেকে ইউনিসেফের একটা চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের শুট চলছে। সেখানে এক শিশুর সাথে ছবি তুলতে হবে। সেই শিশুটি ছিল ৫ মাস বয়সী লামিন ইয়ামাল।

…মেসি ছিলেন একটি প্রজন্মের শৈশব। ইয়ামাল হবেন পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব। ফুটবল এভাবেই বেঁচে থাকে। একজন শেষ করেন অশ্রু দিয়ে। আরেকজন শুরু করেন স্বপ্ন দিয়ে। একজন বিদায় নেয়, আরেকজন এসে বলে, আমি আছি। একটা সময় স্পেনকে বলা হতো, বলতো কোয়ার্টার ফাইনালের দল। আজ সেই স্পেনই দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

বাবা মরক্কান, মা গিনি থেকে আসা। মাতারো শহরের এক ছোট্ট ঘরে থাকেন। মেসি তখন গোসল করাচ্ছেন সেই বাচ্চাটাকে। মা শায়লা পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন। কে জানতো, যিনি গোসল করিয়েছেন, তিনি একদিন ফুটবলের সর্বেসর্বা হবেন আর যাকে গোসল করানো হয়েছে, তিনি হবেন তারই উত্তরসূরি। এমনকি কোলে নেওয়া সেই শিশুর কাছে হেরে বিদায় নিতে হবে, এটা ভাবার প্রশ্নই আসে না।

এই দুজনের আলিঙ্গন শুধু একটা ছবি নয়, এটা ফুটবলের দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন। ২০০৭ সালে মেসির কোলে ছিল ইয়ামালের শরীর আর ২০২৬ সালে ইয়ামালের পায়ে ছিল মেসির জাদু। আজ মেসি যখন অশ্রুময় চোখে বিদায় নেন, তখন ইয়ামাল বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে উল্লাস করেন।

এটাই জগতের নিয়ম। ইয়ামাল ২০২৪ ইউরো জিতেছিলেন ১৭ বছর বয়সে আর ২০২৬ বিশ্বকাপ জিতলেন ১৯ বছর বয়সে। ফুটবল ইতিহাসে এত কম বয়সে ইউরো আর বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড আর কারও নেই।

ইয়ামালের অভিষেকটা দুর্দান্ত। ফুটবল মাঠে তার অভিধানে ভয় বলতে কিছু নেই। ফাইনালের মতো মঞ্চে তিনি তিনজনকে ড্রিবল করে বেরিয়ে যান, যেন পাড়ার মাঠে খেলছেন। তার পায়ে মেসির ছোঁয়া আছে, কিন্তু তার চলায় নিজের আলো আছে। মেসি ফুটবলকে শিখিয়েছিল কীভাবে হারতে হারতে জিততে হয়। আর ইয়ামাল শুরু করলেন তার পরবর্তী অধ্যায় থেকে, যেখানে লেখা আছে, ফুটবল এখনো সুন্দর।

মেসি ছিলেন একটি প্রজন্মের শৈশব। ইয়ামাল হবেন পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব। ফুটবল এভাবেই বেঁচে থাকে। একজন শেষ করেন অশ্রু দিয়ে। আরেকজন শুরু করেন স্বপ্ন দিয়ে। একজন বিদায় নেয়, আরেকজন এসে বলে, আমি আছি।

একটা সময় স্পেনকে বলা হতো, বলতো কোয়ার্টার ফাইনালের দল। আজ সেই স্পেনই দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তারা প্রমাণ করলো, সুন্দর ফুটবল খেলেও জেতা যায়। হয়তো একটু সময় লাগে, কিন্তু জেতা যায়। অভিনন্দন লা রোহা, দ্য রেড ওয়ান, তোমরা দেখিয়ে দিলে কেন ফুটবলকে সুন্দর খেলা বলা হয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

মেসি যুগের সূর্যাস্ত, ইয়ামাল যুগের সূর্যোদয়

Update Time : 05:42:52 am, Monday, 20 July 2026
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান। দীর্ঘ ১৬ বছর আর চারটা বিশ্বকাপ পেরিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে স্পেন। বিশ্বকাপের ট্রফিটা আর লাতিন আমেরিকায় থাকল না। ফিরল ইউরোপে। ফিরল স্পেনে। ফিরল ফুটবলের ধাত্রীভূমিতে। তবে জয় হয়েছে সুন্দর ফুটবলের।

যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮২ হাজার দর্শকের সামনে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দলটাই জিতল। জিতল ফুটবল নিজেই। স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে স্পেন ১ আর আর্জেন্টিনা ০। কিন্তু স্কোরবোর্ডে কখনো পুরো দৃশ্যপট ফুটে উঠে না। এই ম্যাচে স্পেন ইয়োহান ক্রুইফের ফুটবল দর্শন ‘টিকিটাকা’ দিয়ে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে যেভাবে ফালা ফালা করে দিয়েছে, তা ছিল অকল্পনীয়।

‘লা আলবিসেলেস্তে’কে এদিন যেন মাঠে নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে। প্রতিটি ম্যাচ দাপটের সঙ্গে খেলে, আসল ম্যাচেই লিওনেল মেসির দল কেন যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে।

এই বিশ্বকাপটা স্পেনের জন্য শুধু একটা ট্রফি না, এটা ছিল একটা জবাব। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০১৮ তে রাশিয়ায় স্বাগতিক রাশিয়ার কাছেই টাইব্রেকারে হার, ২০২২ এ মরক্কোর কাছে একইভাবে হার। প্রতিবারই তাদের শুনতে হয়েছে, টিকিটাকা শেষ, স্পেন শেষ। পাস পাস করে গোল হয় না।

ফুটবল এখন ফিজিক্যাল, ফুটবল এখন গতির। আর সেই সব সমালোচনার জবাব স্পেন দিলো মাঠেই, তাদের নিজেদের ভাষায়, পাস দিয়ে। দেখাল পাসের নান্দনিক এক প্রদর্শনী। এই জয়টা ফুটবল কোচিং-এর জন্য একটা বার্তা।

যখন পুরো বিশ্ব ফিজিক্যাল ফুটবল, লং বল আর কাউন্টার অ্যাটাকের দিকে ঝুঁকছে, তখন স্পেন দেখাল পাসিং ফুটবল দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায়, যদি সেই পাসিংয়ে উদ্দেশ্য থাকে।

এবারের স্পেন ২০১০ এর স্পেন নয়। সেই স্পেন ছিল ধীর, নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর ছুরি চালানো। জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সার্জিও বুসকেটস, জাবি আলোনসোরা বলকে বন্দি করে রাখতেন, প্রতিপক্ষ দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে গোল করতেন।

আর এবারের স্পেন হলো বিদ্যুতের মতো। সেই পাসিং দর্শন আছে, কিন্তু তার সাথে যোগ হয়েছে ধারালো ছুরি। লুইস দে লা ফুয়েন্তে যা করেছেন, তা কোনো বড় কোচ করেননি। তার হাতে বড় কোনো নাম ছিল না। তিনি করেছেন সবচেয়ে কঠিন কাজটা, লা মাসিয়া আর বাস্ক অঞ্চলের একাডেমির ছেলেদের বিশ্বাস করেছেন।

বার্সেলোনা, রিয়াল সোসিয়েদাদ, অ্যাথলেটিক বিলবাও-এর ছেলেদের দিয়ে একটা পরিবার বানিয়েছেন। এই দলে কোনো সুপারস্টারের ইগো ছিল না, আছে শুধু একটা সিস্টেমের প্রতি ভালোবাসা।

এই স্পেনে আছেন লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, নিকো উইলিয়ামস, মিকেল ওইয়ারসাবাল, ফেরান তোরেসরা। বল পায়ে তারা খুব দ্রুত নিজেদের বক্স থেকে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছে যান। তাদের টিকিটাকা যে এত নিখুঁত হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। যেন স্কেল দিয়ে মাপা। প্রতিটা মুভমেন্ট ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলনের ফল, তা না বোঝার কোনো কারণ নেই।

এই জয়টা লা লিগারও জয়। যখন সবাই ভাবছিল প্রিমিয়ার লিগই সব। লা লিগা শেষ। টাকা নেই। তারকা নেই। তখন স্পেনের খেলোয়াড়রা দেখালেন, তাদের ঘরোয়া লিগ এখনো বিশ্বের সেরা ট্যালেন্ট তৈরি করে।

যখন পুরো বিশ্ব ফিজিক্যাল ফুটবল, লং বল আর কাউন্টার অ্যাটাকের দিকে ঝুঁকছে, তখন স্পেন দেখাল পাসিং ফুটবল দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায়, যদি সেই পাসিংয়ে দক্ষতা থাকে।

ফাইনালের রাতটা ছিল ফুটবলের দুই দর্শনের লড়াই। একদিকে স্পেনের ৬৮ শতাংশ বল দখল, ৮০৩টা পাসের ফুল ফোটানো ফুটবল।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার রাফ ফুটবল, যেখানে সৌন্দর্য থামাতে ফাউলই ছিল প্রধান অস্ত্র। যতটা না পজিটিভ ফুটবল খেলেছে, তার চেয়ে বেশি খেলেছে নেগেটিভ ফুটবল। সত্যি বলতে, আর্জেন্টিনা এদিন পাত্তাই পায়নি। অনেক বেশি গোলে হারলে অবাক হওয়ার থাকতো না। এ ম্যাচে তারা জিতলে স্পেনের প্রতি অবিচার হতো।

প্রথমার্ধ থেকেই স্পেন আর্জেন্টিনাকে তাদের নিজেদের অর্ধেই আটকে রেখেছিল। মেসি একা আর কী করবেন? যৌবনের সেই দিন তো আর নেই। মাঝমাঠে পেদ্রি আর রদ্রি তাকে ঘিরে রেখেছিলেন। আর্জেন্টিনা বারবার খেলার ছন্দ নষ্ট করেছে, ট্যাকলে ট্যাকলে ভরিয়ে দিয়েছে ম্যাচ।

রেফারিকে বাধ্য হয়ে কার্ড বের করতে হয়েছে। তাদের দেখাতে হয়েছে পাঁচটি হলুদ কার্ড। এক পর্যায়ে ১০ জনে পরিণত হয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। তারা ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে, কিন্তু জিততে পারেনি।

৯০ মিনিট গোলশূন্য। অতিরিক্ত সময়ে যখন সবাই টাইব্রেকারের প্রহর গুনছে, তখনই এলো সেই মুহূর্ত। ৯৮ মিনিটে পেদ্রির বাড়ানো থ্রু বল, ইয়ামাল ডান দিক থেকে ভেতরে কেটে ঢুকে ডিফেন্সকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেন আর বক্সে ফাঁকায় দাঁড়ানো ফেরান তোরেস ঠান্ডা মাথায় বাঁ পায়ের ফিনিশে গোল। বেঞ্চ থেকে উঠে এসে বিশ্বকাপ জেতানো গোল। স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে এই গোলটা নিঃসন্দেহে অমূল্য হয়ে থাকবে।

শেষ বাঁশিটা বাজলো। মেটলাইফের আকাশে আতশবাজি, লাল-হলুদ উৎসব। আর মাঝমাঠে একা দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। চোখ বেয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। এটা খুবই স্বাভাবিক।

গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর অনেক মুকুট মাথায় থাকলেও বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে যাওয়ার কষ্ট মেনে নেওয়া সহজ নয়। সামনে ছিল অনেক বড় ইতিহাস গড়ার হাতছানি।

এই দৃশ্যটা তার অনুরাগীরা দেখতে চায়নি। ৩৯ বছরের মেসির জার্সিটা ঘামে ভেজা, হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, হাত নেড়ে অশ্রুভেজা চোখে বিদায় জানাচ্ছেন। পুরো স্টেডিয়াম, এমনকি স্পেনের সমর্থকরাও উঠে দাঁড়ালেন। চোখে পানি নিয়ে করতালি। ২০টা বছর ধরে ফুটবলকে আরাধনার মতো করে তুলেছিলেন।

২০২২ এর হাসি আর ২০২৬ এর কান্না দিয়ে বিদায় নিতে হলো। ফুটবল তাকে সব দিয়েছে, তিনিও ফুটবলকে দিতে কার্পণ্য করেননি। বিদায়ী মুহূর্তে আজ আর তার কিছু চাওয়ার নেই, দেওয়ারও নেই। মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ উদ্দেশ্যবিহীন তাকিয়ে থাকেন। সেই অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা হয় না।

এটা শুধু আর্জেন্টিনা বা বিশ্ব ফুটবলের এক মহানায়কের বিদায় নয়, এটা গৌরবময় এক অধ্যায়ের অবসান। যারা মেসির ড্রিবলে দেখে বড় হয়েছেন, তার ফ্রি কিকে আনন্দিত হয়েছেন, তাদের কাছে এটা বড় কষ্টের।

একটা পর্যায়ে, অন্য প্রান্ত থেকে দৌড়ে মাঠে আসেন ১৯ বছরের একটা ছেলে। পিঠে ১৯ নম্বর জার্সি। লামিন ইয়ামাল। চোখে আগুন, মুখে শিশুর হাসি। আবেগে জড়িয়ে ধরেন মেসিকে। মুখে বিষণ্নতা থাকলেও যোগ্য উত্তরসূরিকে বুকের উষ্ণতায় অভিবাদন জানালেন মেসি। সম্ভবত মনে মনে আশীর্বাদও করেন।

ফুটবল কখনো কখনো ভবিষ্যৎ আগেই লিখে রাখে। ২০০৭ সালে মেসির বয়স তখন ২০, সদ্য বার্সেলোনায় নিজের জায়গা পাকা করছেন। বার্সেলোনার পক্ষ থেকে ইউনিসেফের একটা চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের শুট চলছে। সেখানে এক শিশুর সাথে ছবি তুলতে হবে। সেই শিশুটি ছিল ৫ মাস বয়সী লামিন ইয়ামাল।

…মেসি ছিলেন একটি প্রজন্মের শৈশব। ইয়ামাল হবেন পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব। ফুটবল এভাবেই বেঁচে থাকে। একজন শেষ করেন অশ্রু দিয়ে। আরেকজন শুরু করেন স্বপ্ন দিয়ে। একজন বিদায় নেয়, আরেকজন এসে বলে, আমি আছি। একটা সময় স্পেনকে বলা হতো, বলতো কোয়ার্টার ফাইনালের দল। আজ সেই স্পেনই দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

বাবা মরক্কান, মা গিনি থেকে আসা। মাতারো শহরের এক ছোট্ট ঘরে থাকেন। মেসি তখন গোসল করাচ্ছেন সেই বাচ্চাটাকে। মা শায়লা পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন। কে জানতো, যিনি গোসল করিয়েছেন, তিনি একদিন ফুটবলের সর্বেসর্বা হবেন আর যাকে গোসল করানো হয়েছে, তিনি হবেন তারই উত্তরসূরি। এমনকি কোলে নেওয়া সেই শিশুর কাছে হেরে বিদায় নিতে হবে, এটা ভাবার প্রশ্নই আসে না।

এই দুজনের আলিঙ্গন শুধু একটা ছবি নয়, এটা ফুটবলের দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন। ২০০৭ সালে মেসির কোলে ছিল ইয়ামালের শরীর আর ২০২৬ সালে ইয়ামালের পায়ে ছিল মেসির জাদু। আজ মেসি যখন অশ্রুময় চোখে বিদায় নেন, তখন ইয়ামাল বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে উল্লাস করেন।

এটাই জগতের নিয়ম। ইয়ামাল ২০২৪ ইউরো জিতেছিলেন ১৭ বছর বয়সে আর ২০২৬ বিশ্বকাপ জিতলেন ১৯ বছর বয়সে। ফুটবল ইতিহাসে এত কম বয়সে ইউরো আর বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড আর কারও নেই।

ইয়ামালের অভিষেকটা দুর্দান্ত। ফুটবল মাঠে তার অভিধানে ভয় বলতে কিছু নেই। ফাইনালের মতো মঞ্চে তিনি তিনজনকে ড্রিবল করে বেরিয়ে যান, যেন পাড়ার মাঠে খেলছেন। তার পায়ে মেসির ছোঁয়া আছে, কিন্তু তার চলায় নিজের আলো আছে। মেসি ফুটবলকে শিখিয়েছিল কীভাবে হারতে হারতে জিততে হয়। আর ইয়ামাল শুরু করলেন তার পরবর্তী অধ্যায় থেকে, যেখানে লেখা আছে, ফুটবল এখনো সুন্দর।

মেসি ছিলেন একটি প্রজন্মের শৈশব। ইয়ামাল হবেন পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব। ফুটবল এভাবেই বেঁচে থাকে। একজন শেষ করেন অশ্রু দিয়ে। আরেকজন শুরু করেন স্বপ্ন দিয়ে। একজন বিদায় নেয়, আরেকজন এসে বলে, আমি আছি।

একটা সময় স্পেনকে বলা হতো, বলতো কোয়ার্টার ফাইনালের দল। আজ সেই স্পেনই দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তারা প্রমাণ করলো, সুন্দর ফুটবল খেলেও জেতা যায়। হয়তো একটু সময় লাগে, কিন্তু জেতা যায়। অভিনন্দন লা রোহা, দ্য রেড ওয়ান, তোমরা দেখিয়ে দিলে কেন ফুটবলকে সুন্দর খেলা বলা হয়।