Dhaka 1:02 am, Wednesday, 17 June 2026

টাকা অভাবে মাকে সঙ্গে আনতে পারিনি’—স্পেনকে রুখে দিয়ে আবেগাপ্লুত ভোজিনহা

নিজস্ব প্রতিবেদন
  • Update Time : 05:24:36 am, Tuesday, 16 June 2026
  • / 41 Time View

স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ইতিহাস গড়েছে কেপ ভার্দে। ম্যাচে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন দলটির ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। তবে ম্যাচ শেষের পর উদযাপনের বদলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কেপ ভার্দের এই বিশ্বকাপ নায়কের মা গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য তার ছিল না। ভোজিনহা এই ম্যাচকে তার ‘সারা জীবনের’ পরিশ্রমের ফল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটি যদি তার প্রয়াত দাদা-দাদী এবং মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেপ ভার্দেকে এমন একটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে দেশটির নাগরিকদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ভিসা ফির পাশাপাশি অতিরিক্ত ১৫ হাজার ডলার ফেরতযোগ্য জামানত জমা দিতে হয়। এই অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারায় ভোজিনহার মা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি।

গত ১৩ বছর ধরে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমি কেঁদেছিলাম কারণ আমি আমার দাদা-দাদীর কাছে বড় হয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ এখানে নেই; কয়েক বছর আগে তারা মারা গেছেন। তারা আমার জীবনের সবকিছু ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আরও কেঁদেছিলাম কারণ ভিসার সমস্যার কারণে আমার মা এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়েছে, তা আমরা সময়মতো জোগাড় করতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম তিনি আজ পাশে থাকুন, তবে দলের এই সাফল্যে আমি অনেক খুশি।’

ভোজিনহা বলেন, ‘এই দিনটির জন্য আমি সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমার বয়স এখন ৪০। ২০১২ সালে ২৫ বছর বয়সে আমি পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করি। মাঝে অনেকবার খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছি, কিন্তু শুধু এই স্বপ্নটির জন্য আমি দমে যাইনি। এই অর্জন সবার জন্য। আমি ম্যাচ সেরা হয়েছি ঠিকই, কিন্তু এটি আমার সকল সতীর্থের কৃতিত্ব। তাদের ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব হতো না। আমি আমার দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব।’

পুরো ম্যাচে বলের দখল বেশি ছিল স্পেনের। তবে কেপ ভার্দের সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে তারা বেগ পায়। ইউরো চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে ফেরান তোরেসের পা থেকে, কিন্তু তার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এছাড়া লক্ষ্যে থাকা বাকি আক্রমণগুলোও ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা।

ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবথেকে বড় হাতিয়ার হলো ঐক্য। পরিবারের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও যত্নই আমাদের শক্তির মূল উৎস। সবাই ভেবেছিল আমরা এখানে কেবল বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছি, কিন্তু আমরা জানি আমাদের এমন একটি দল আছে যারা সম্মানের যোগ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি আমাদের প্রথম বিশ্বকাপ, তবে আমরা এখানে আমাদের দেশের হয়ে লড়াই করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছি। আমরা প্রতিটি ম্যাচেই আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও কোচের কৌশল অনুযায়ী খেলব। আমরা সামনের ম্যাচগুলোতে আজকের চেয়েও ভালো করার চেষ্টা করব।’

ভোজিনহা বলেন, ‘আশা করছি আমরা কিছু জয় পাব এবং কে জানে, হয়তো পরবর্তী রাউন্ডেও পৌঁছে যেতে পারি। আমি আমাদের দলের সকল খেলোয়াড়কে নিয়ে অত্যন্ত খুশি এবং গর্বিত।’

কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা বলেন, ‘ভোজিনহা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। এখানে পৌঁছাতে তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার এই চোখের জল ছিল আসলে প্রতিকূলতা জয়ের আনন্দ। আমি ব্যক্তিগত কাউকে নিয়ে আলাদা করে বলতে পছন্দ করি না, তবে ও আজ দুর্দান্ত খেলেছে। পুরো দল আজ খুব শান্ত ছিল, যা তাকেও গোলপোস্টের নিচে আত্মবিশ্বাসী থাকতে সাহায্য করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই অর্জনের গুরুত্ব আমাদের দেশের জন্য অনেক বেশি। আমরা সবসময় চেয়েছি, পুরো বিশ্ব দেখুক আমাদের দল কেমন ফুটবল খেলে। আমরা আজ সাহস দেখিয়েছি এবং যেভাবে খেলেছি তা আমাদের দেশেরই প্রতিচ্ছবি—অদম্য ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সব বাধা জয় করে এগিয়ে চলা।’

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

টাকা অভাবে মাকে সঙ্গে আনতে পারিনি’—স্পেনকে রুখে দিয়ে আবেগাপ্লুত ভোজিনহা

Update Time : 05:24:36 am, Tuesday, 16 June 2026

স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ইতিহাস গড়েছে কেপ ভার্দে। ম্যাচে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন দলটির ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। তবে ম্যাচ শেষের পর উদযাপনের বদলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কেপ ভার্দের এই বিশ্বকাপ নায়কের মা গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য তার ছিল না। ভোজিনহা এই ম্যাচকে তার ‘সারা জীবনের’ পরিশ্রমের ফল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটি যদি তার প্রয়াত দাদা-দাদী এবং মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেপ ভার্দেকে এমন একটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে দেশটির নাগরিকদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ভিসা ফির পাশাপাশি অতিরিক্ত ১৫ হাজার ডলার ফেরতযোগ্য জামানত জমা দিতে হয়। এই অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারায় ভোজিনহার মা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি।

গত ১৩ বছর ধরে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমি কেঁদেছিলাম কারণ আমি আমার দাদা-দাদীর কাছে বড় হয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ এখানে নেই; কয়েক বছর আগে তারা মারা গেছেন। তারা আমার জীবনের সবকিছু ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আরও কেঁদেছিলাম কারণ ভিসার সমস্যার কারণে আমার মা এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়েছে, তা আমরা সময়মতো জোগাড় করতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম তিনি আজ পাশে থাকুন, তবে দলের এই সাফল্যে আমি অনেক খুশি।’

ভোজিনহা বলেন, ‘এই দিনটির জন্য আমি সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমার বয়স এখন ৪০। ২০১২ সালে ২৫ বছর বয়সে আমি পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করি। মাঝে অনেকবার খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছি, কিন্তু শুধু এই স্বপ্নটির জন্য আমি দমে যাইনি। এই অর্জন সবার জন্য। আমি ম্যাচ সেরা হয়েছি ঠিকই, কিন্তু এটি আমার সকল সতীর্থের কৃতিত্ব। তাদের ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব হতো না। আমি আমার দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব।’

পুরো ম্যাচে বলের দখল বেশি ছিল স্পেনের। তবে কেপ ভার্দের সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে তারা বেগ পায়। ইউরো চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে ফেরান তোরেসের পা থেকে, কিন্তু তার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এছাড়া লক্ষ্যে থাকা বাকি আক্রমণগুলোও ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা।

ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবথেকে বড় হাতিয়ার হলো ঐক্য। পরিবারের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও যত্নই আমাদের শক্তির মূল উৎস। সবাই ভেবেছিল আমরা এখানে কেবল বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছি, কিন্তু আমরা জানি আমাদের এমন একটি দল আছে যারা সম্মানের যোগ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি আমাদের প্রথম বিশ্বকাপ, তবে আমরা এখানে আমাদের দেশের হয়ে লড়াই করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছি। আমরা প্রতিটি ম্যাচেই আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও কোচের কৌশল অনুযায়ী খেলব। আমরা সামনের ম্যাচগুলোতে আজকের চেয়েও ভালো করার চেষ্টা করব।’

ভোজিনহা বলেন, ‘আশা করছি আমরা কিছু জয় পাব এবং কে জানে, হয়তো পরবর্তী রাউন্ডেও পৌঁছে যেতে পারি। আমি আমাদের দলের সকল খেলোয়াড়কে নিয়ে অত্যন্ত খুশি এবং গর্বিত।’

কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা বলেন, ‘ভোজিনহা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। এখানে পৌঁছাতে তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার এই চোখের জল ছিল আসলে প্রতিকূলতা জয়ের আনন্দ। আমি ব্যক্তিগত কাউকে নিয়ে আলাদা করে বলতে পছন্দ করি না, তবে ও আজ দুর্দান্ত খেলেছে। পুরো দল আজ খুব শান্ত ছিল, যা তাকেও গোলপোস্টের নিচে আত্মবিশ্বাসী থাকতে সাহায্য করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই অর্জনের গুরুত্ব আমাদের দেশের জন্য অনেক বেশি। আমরা সবসময় চেয়েছি, পুরো বিশ্ব দেখুক আমাদের দল কেমন ফুটবল খেলে। আমরা আজ সাহস দেখিয়েছি এবং যেভাবে খেলেছি তা আমাদের দেশেরই প্রতিচ্ছবি—অদম্য ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সব বাধা জয় করে এগিয়ে চলা।’