Dhaka 5:25 pm, Saturday, 29 August 2026

পরিবার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা,  বাবা-মায়ের আজীবন আর্তনাদ

Reporter Name
  • Update Time : 09:59:25 am, Saturday, 29 August 2026
  • / 8 Time View

নিখোঁজের পরিসংখ্যান ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য: গত সাত মাসে সারা দেশের থানাগুলোতে ১৫ হাজার শিশু হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত হয়েছে, যার মাসিক গড় প্রায় ২,২৪৫ জন।

 

‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ ও প্রযুক্তির গুরুত্ব: শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ অত্যন্ত সংবেদনশীল; এই সময়ে দ্রুত তথ্য প্রচার ও প্রযুক্তিগত অ্যালার্ট শিশু উদ্ধারের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

পুনর্বাসন ও আশ্রিত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা: শেল্টার হোমগুলোতে আশ্রয় নেওয়া শিশুদের অনেকেই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও নিজ ঠিকানায় ফিরতে পারে না বা স্মৃতির ধোঁয়াশার কারণে স্বজনদের খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে।

 

অপরাধচক্র ও সচেতনতার অভাব: প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শিশুদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে ফেলছে, যা রোধে সামাজিক আন্দোলন ও কার্যকর নজরদারি জরুরি।

 

বিশেষজ্ঞ মন্তব্য

 

ড. জাকির হোসেন (সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ): “শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোর পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এককার্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে হবে এবং রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও নৌবন্দরগুলোতে রিয়্যাল-টাইম সার্ভেইলেন্স বা এআই ভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে।”

 

ব্যারিস্টার সারা হোসেন (মানবাধিকার আইনজীবী): “থানা পর্যায়ে জিডি করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ সান্ত্বনা বা ধর্মীয় উপদেশ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনাকে হাই-প্রোফাইল কেস হিসেবে নিয়ে দ্রুত ট্র্যাকিং সেল সক্রিয় করা রাষ্ট্রীয় ও আইনি দায়িত্ব।”

 

মুস্তাকিম নিবিড়ঃ

কোলাহলে ভরা এই চেনা শহরে প্রতিদিন কত মানুষ আসে, কত মানুষ যায়। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ হারিয়ে যায় কোনো এক চেনা মুখ, কোনো এক অবুঝ শিশু। ঢাকা কিংবা মফস্বলের ব্যস্ত অলিগলি, বাস টার্মিনাল, খেলার মাঠ কিংবা শপিংমল—সব জায়গাতেই লুকিয়ে আছে এক অজানা আতঙ্ক। মুহূর্তের অসতর্কতায় চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হারিয়ে যায় অবুঝ প্রাণগুলো। কারো কোল খালি হয় চিরতরে, কারো বা জীবনে নেমে আসে অনন্ত প্রতীক্ষা।

 

চার বছরের রূপা এক বছর আগে বিকেলে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি। ১০ বছরের বড় ভাই রিফাত সাইকেলের পেছনে সিট শূন্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বোনের খোঁজে এখনো। পুলিশ একদিনই এসেছিল কিন্তু কোনো কাজ হয়নি, আক্ষেপ উনার মায়ের। চোখের জল আর অপেক্ষা শেষ হয় না। নিখোঁজ রূপার মা আক্ষেপ করে বলেন, “বারবার থানায় গেছি, হতাশ হয়ে ফিরছি। উনারা আমাকে শিখায়ে দেয়—দোয়া পড়, আল্লাহকে ডাক। দেশ এবং বিদেশে ভাই-বোন সবার কাছে আমার অনুরোধ যে, সবাই মিলে আমার মেয়েকে খুঁজুন।” রূপার মতো হাজারো শিশুর পরিবার প্রতিদিন এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আইনের দুয়ারে ঘুরে ঘুরে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে অসহায় পরিবারগুলো, তখন তাদের সম্বল হয়ে ওঠে কেবল চোখের জল আর আকুতি।

 

তবে মাঝে মাঝে আলোর রেখাও দেখা মেলে। পাঁচ বছরের মুসকান আর আট বছরের সাইফ দুই ভাই-বোন খেলছিল নানাবাড়ির সামনে। সেখান থেকে বেড়ানোর প্রলোভন দিয়ে পাশের হোটেলের কর্মচারী দুই শিশুকে অপহরণ করে। থানার পাশাপাশি মুসকানের বাবা জুয়েল ‘মুন অ্যালার্ট’ টোল ফ্রি নম্বর ১৩২১৯-এ যোগাযোগ করে। সৌভাগ্যবশত এই পিতা ফিরে পান শিশুদের। মুসকানের বাবা জুয়েল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, “মেয়েকে নিয়ে চলে যাওয়ার পরে আমার ছোট ভাই আর কি ইয়া ‘মুন অ্যালার্ট’কে ইনফরমেশন করে। যখন মনে করেন এই অ্যালার্টটা জারি হয়, জারি হওয়ার সময় এই আসামী রাত্রে না, সকালবেলা সম্ভবত ও দেখছে। দেখার পরে সদরঘাট টার্মিনালে একটা আপনার বিলবোর্ড আছে, বিলবোর্ডে যখন মেয়ের ছবি ভেসে উঠছে, ও ভয়তে আমার মেয়েকে ওইখানে রাইখেই চইলা গেছে।” এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান কীভাবে একটি শিশুকে নিশ্চিত বিপদের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

কিন্তু সবার ভাগ্য কি মুসকানের মতো সুপ্রসন্ন হয়? গত সাত মাসে ১৫ হাজার শিশু হারানোর জিডি হয়েছে সারা দেশের থানাগুলোতে। অর্থাৎ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী মাসে গড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ২,২৪৫ জন শিশু। এদের মধ্যে একটি বড় সংখ্যা উদ্ধার হয়ে ফিরে এলেও দীর্ঘমেয়াদে নিখোঁজ ও পাচারের শিকার শিশুদের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহতাসূচক। পুলিশ দাবি করছে, উদ্ধার হওয়া শিশুদের একটি অংশকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি কতটা দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক?

 

উদ্ধারের পর সবাই কি ফিরতে পারে আপন ঠিকানায়? তাদের আশ্রয় কোথায় হয়? অপরাজয় বাংলাদেশ শেল্টার হোমের হালিমা তাই আট বছর পরেও ফিরতে চায়নি নিজ বাড়িতে। হালিমা, শেল্টার হোমে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশু, তার স্মৃতির জানালা থেকে জানায়, “ভাইয়ার সাথে আর নানির সাথে বাইরে কোথাও যাচ্ছিলাম। পিছে আমি ঘুমায় গেছিলাম। পরে বাস থামছে, নানি আর ভাইয়া নেমে গেছে… ভাইয়াকে দেখতে ইচ্ছে করে।” শৈশবের সেই বিচ্ছেদের ক্ষত আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অন্যদিকে, নুরুন্নাহারের মতো কিছু শিশু দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আপন ঠিকানায় ফিরতে পারে। শেল্টার হোম কর্মকর্তা জানান, “যে জেলা থেকে ওরা বড় হইছে সেই জেলা এবং যেখান থেকে বড় হইছে গ্রাম, এই দুইটা নাম বলতে পারলে আমরা কোনো না কোনোভাবে ক্লু বের করে সেখানে পৌঁছাই। শিশু তো অনেক ছোটতে হারায় গেছে, তো ৬ বছরে আমরা পেয়েছিলাম। তো বলতো যে, আমার হচ্ছে বাংলাবাজার… বাংলাবাজার, নোয়াখালী।” এই সামান্য সূত্র ধরেই স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আট বছর পর বাড়ি ফিরেছিল সে।

 

শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে এটিকে ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ বলা হয়। এই সময়ে যত দ্রুত অনুসন্ধান করা যায় এবং বেশি সংখ্যক মানুষকে তথ্য জানানো যায়, তবে শিশুকে শনাক্ত করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এই ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’-এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী পরিকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। থানা পুলিশে জিডি করার পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রথম ও মূল্যবান সময়টুকুই নষ্ট হয়ে যায়।

 

নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে এবং এই সামাজিক ব্যাধি রোধে কেবল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে একীভূত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি পাবলিক প্লেসে আধুনিক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডিজিটাল বিলবোর্ড ও মোবাইল নোটিফিকেশন সিস্টেমের পরিধি বাড়াতে হবে। রূপা কিংবা হালিমার মতো আর কোনো শিশুর শৈশব যেন হারিয়ে না যায় অচেনা কোনো ঠিকানায়—এটাই হোক আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। হাড়িয়ে যাওয়া কোমলমতি শিশুদের হাড়িয়ে যাওয়ার আদ্যপান্ত জানতে ও জানাতে চায় দ্যা টাইমস অব ঢাকার অনুসন্ধান টিম।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

পরিবার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা,  বাবা-মায়ের আজীবন আর্তনাদ

Update Time : 09:59:25 am, Saturday, 29 August 2026

নিখোঁজের পরিসংখ্যান ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য: গত সাত মাসে সারা দেশের থানাগুলোতে ১৫ হাজার শিশু হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত হয়েছে, যার মাসিক গড় প্রায় ২,২৪৫ জন।

 

‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ ও প্রযুক্তির গুরুত্ব: শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ অত্যন্ত সংবেদনশীল; এই সময়ে দ্রুত তথ্য প্রচার ও প্রযুক্তিগত অ্যালার্ট শিশু উদ্ধারের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

পুনর্বাসন ও আশ্রিত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা: শেল্টার হোমগুলোতে আশ্রয় নেওয়া শিশুদের অনেকেই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও নিজ ঠিকানায় ফিরতে পারে না বা স্মৃতির ধোঁয়াশার কারণে স্বজনদের খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে।

 

অপরাধচক্র ও সচেতনতার অভাব: প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শিশুদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে ফেলছে, যা রোধে সামাজিক আন্দোলন ও কার্যকর নজরদারি জরুরি।

 

বিশেষজ্ঞ মন্তব্য

 

ড. জাকির হোসেন (সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ): “শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোর পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এককার্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে হবে এবং রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও নৌবন্দরগুলোতে রিয়্যাল-টাইম সার্ভেইলেন্স বা এআই ভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে।”

 

ব্যারিস্টার সারা হোসেন (মানবাধিকার আইনজীবী): “থানা পর্যায়ে জিডি করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ সান্ত্বনা বা ধর্মীয় উপদেশ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনাকে হাই-প্রোফাইল কেস হিসেবে নিয়ে দ্রুত ট্র্যাকিং সেল সক্রিয় করা রাষ্ট্রীয় ও আইনি দায়িত্ব।”

 

মুস্তাকিম নিবিড়ঃ

কোলাহলে ভরা এই চেনা শহরে প্রতিদিন কত মানুষ আসে, কত মানুষ যায়। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ হারিয়ে যায় কোনো এক চেনা মুখ, কোনো এক অবুঝ শিশু। ঢাকা কিংবা মফস্বলের ব্যস্ত অলিগলি, বাস টার্মিনাল, খেলার মাঠ কিংবা শপিংমল—সব জায়গাতেই লুকিয়ে আছে এক অজানা আতঙ্ক। মুহূর্তের অসতর্কতায় চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হারিয়ে যায় অবুঝ প্রাণগুলো। কারো কোল খালি হয় চিরতরে, কারো বা জীবনে নেমে আসে অনন্ত প্রতীক্ষা।

 

চার বছরের রূপা এক বছর আগে বিকেলে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি। ১০ বছরের বড় ভাই রিফাত সাইকেলের পেছনে সিট শূন্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বোনের খোঁজে এখনো। পুলিশ একদিনই এসেছিল কিন্তু কোনো কাজ হয়নি, আক্ষেপ উনার মায়ের। চোখের জল আর অপেক্ষা শেষ হয় না। নিখোঁজ রূপার মা আক্ষেপ করে বলেন, “বারবার থানায় গেছি, হতাশ হয়ে ফিরছি। উনারা আমাকে শিখায়ে দেয়—দোয়া পড়, আল্লাহকে ডাক। দেশ এবং বিদেশে ভাই-বোন সবার কাছে আমার অনুরোধ যে, সবাই মিলে আমার মেয়েকে খুঁজুন।” রূপার মতো হাজারো শিশুর পরিবার প্রতিদিন এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আইনের দুয়ারে ঘুরে ঘুরে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে অসহায় পরিবারগুলো, তখন তাদের সম্বল হয়ে ওঠে কেবল চোখের জল আর আকুতি।

 

তবে মাঝে মাঝে আলোর রেখাও দেখা মেলে। পাঁচ বছরের মুসকান আর আট বছরের সাইফ দুই ভাই-বোন খেলছিল নানাবাড়ির সামনে। সেখান থেকে বেড়ানোর প্রলোভন দিয়ে পাশের হোটেলের কর্মচারী দুই শিশুকে অপহরণ করে। থানার পাশাপাশি মুসকানের বাবা জুয়েল ‘মুন অ্যালার্ট’ টোল ফ্রি নম্বর ১৩২১৯-এ যোগাযোগ করে। সৌভাগ্যবশত এই পিতা ফিরে পান শিশুদের। মুসকানের বাবা জুয়েল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, “মেয়েকে নিয়ে চলে যাওয়ার পরে আমার ছোট ভাই আর কি ইয়া ‘মুন অ্যালার্ট’কে ইনফরমেশন করে। যখন মনে করেন এই অ্যালার্টটা জারি হয়, জারি হওয়ার সময় এই আসামী রাত্রে না, সকালবেলা সম্ভবত ও দেখছে। দেখার পরে সদরঘাট টার্মিনালে একটা আপনার বিলবোর্ড আছে, বিলবোর্ডে যখন মেয়ের ছবি ভেসে উঠছে, ও ভয়তে আমার মেয়েকে ওইখানে রাইখেই চইলা গেছে।” এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান কীভাবে একটি শিশুকে নিশ্চিত বিপদের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

কিন্তু সবার ভাগ্য কি মুসকানের মতো সুপ্রসন্ন হয়? গত সাত মাসে ১৫ হাজার শিশু হারানোর জিডি হয়েছে সারা দেশের থানাগুলোতে। অর্থাৎ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী মাসে গড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ২,২৪৫ জন শিশু। এদের মধ্যে একটি বড় সংখ্যা উদ্ধার হয়ে ফিরে এলেও দীর্ঘমেয়াদে নিখোঁজ ও পাচারের শিকার শিশুদের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহতাসূচক। পুলিশ দাবি করছে, উদ্ধার হওয়া শিশুদের একটি অংশকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি কতটা দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক?

 

উদ্ধারের পর সবাই কি ফিরতে পারে আপন ঠিকানায়? তাদের আশ্রয় কোথায় হয়? অপরাজয় বাংলাদেশ শেল্টার হোমের হালিমা তাই আট বছর পরেও ফিরতে চায়নি নিজ বাড়িতে। হালিমা, শেল্টার হোমে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশু, তার স্মৃতির জানালা থেকে জানায়, “ভাইয়ার সাথে আর নানির সাথে বাইরে কোথাও যাচ্ছিলাম। পিছে আমি ঘুমায় গেছিলাম। পরে বাস থামছে, নানি আর ভাইয়া নেমে গেছে… ভাইয়াকে দেখতে ইচ্ছে করে।” শৈশবের সেই বিচ্ছেদের ক্ষত আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অন্যদিকে, নুরুন্নাহারের মতো কিছু শিশু দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আপন ঠিকানায় ফিরতে পারে। শেল্টার হোম কর্মকর্তা জানান, “যে জেলা থেকে ওরা বড় হইছে সেই জেলা এবং যেখান থেকে বড় হইছে গ্রাম, এই দুইটা নাম বলতে পারলে আমরা কোনো না কোনোভাবে ক্লু বের করে সেখানে পৌঁছাই। শিশু তো অনেক ছোটতে হারায় গেছে, তো ৬ বছরে আমরা পেয়েছিলাম। তো বলতো যে, আমার হচ্ছে বাংলাবাজার… বাংলাবাজার, নোয়াখালী।” এই সামান্য সূত্র ধরেই স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আট বছর পর বাড়ি ফিরেছিল সে।

 

শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে এটিকে ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ বলা হয়। এই সময়ে যত দ্রুত অনুসন্ধান করা যায় এবং বেশি সংখ্যক মানুষকে তথ্য জানানো যায়, তবে শিশুকে শনাক্ত করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এই ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’-এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী পরিকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। থানা পুলিশে জিডি করার পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রথম ও মূল্যবান সময়টুকুই নষ্ট হয়ে যায়।

 

নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে এবং এই সামাজিক ব্যাধি রোধে কেবল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে একীভূত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি পাবলিক প্লেসে আধুনিক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ডিজিটাল বিলবোর্ড ও মোবাইল নোটিফিকেশন সিস্টেমের পরিধি বাড়াতে হবে। রূপা কিংবা হালিমার মতো আর কোনো শিশুর শৈশব যেন হারিয়ে না যায় অচেনা কোনো ঠিকানায়—এটাই হোক আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। হাড়িয়ে যাওয়া কোমলমতি শিশুদের হাড়িয়ে যাওয়ার আদ্যপান্ত জানতে ও জানাতে চায় দ্যা টাইমস অব ঢাকার অনুসন্ধান টিম।