নারী-শিশু নির্যাতনের ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যান আসামিরা, দেড় যুগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাত্র ৫ জনের
- Update Time : 05:44:37 am, Tuesday, 9 June 2026
- / 40 Time View

২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রমাণ মিললেও শুরু থেকেই তদন্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির পর বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার ১০ বছর পার হলেও এখনো কোনো চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। অভিযোগ ওঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের লোকজনের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রুহুল আমিন ও সোহেলসহ ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। ছয় বছর পার হলেও মামলার বিচার শুরু হয়নি। মামলা চালাতে গিয়ে সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে গেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
শুধু আলোচিত এসব ঘটনাই নয়, গত এক দশকে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বহু মামলার বিচার এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে এ ধরনের প্রায় দেড় লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
গত মে মাসে সুপ্রিমকোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন। ৩২টি জেলার ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি ও রেজিস্টার পর্যালোচনা করা হয়। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। এসব মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়েছে। ১৩ শতাংশ মামলায় আপস হয়েছে। তবে রাজধানীর পল্লবীতে সম্প্রতি ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায় ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে নতুন নজির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজ-অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কোনো নারী ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অপরাধীদের শাস্তি পাওয়ার ঘটনা খুবই কম। অপরাধের পর দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা না থাকায় সাধারণ মানুষের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমেছে। তিনি বলেন, জড়িতদের দ্রুত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তৈরি না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমবে না।
ব্র্যাক ও সুপ্রিমকোর্টের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। অন্যদিকে হাইকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন রয়েছে।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে এবং প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রায় দেড় হাজার মামলা বিচারাধীন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সংঘবদ্ধ ও একক ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। একই ধরনের অপরাধে দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় দেড়শ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন, যাদের রায় এখনো কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্সসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে এসব রায় কার্যকর করা যায়নি বলে জানা গেছে।
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার চার ভাগের এক ভাগ ঘটনাও গণমাধ্যমে আসে না। কেবল আলোচিত ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাগুলো বেশি সামনে আসে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হলে স্থানীয় গণমাধ্যমেও বিষয়গুলো প্রকাশ পায় না। তার মতে, প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নারী-সংবেদনশীল পুলিশ ও বিচারকের মাধ্যমে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, সুপ্রিমকোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোতে দ্রুত ও সঠিক তদন্ত এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব।






















